
পারভেজ খান :
একটি প্রচলিত কাহিনি দিয়ে শুরু করি। বাদশাহ আলমগীরের পুত্র একদিন তাঁর শিক্ষকের পায়ে পানি ঢালছিল।বাদশাহ দূর থেকে বিষয়টি লক্ষ্য করলেন। তিনি দেখলেন, রাজপুত্র শিক্ষকের পায়ে পানি ঢালছে ঠিকই, কিন্তু নিজের হাতে শিক্ষকের পা ধুয়ে দিচ্ছে না। বিষয়টি বাদশাহর মনে দাগ কাটল। তিনি পুত্রকে বোঝালেন- শিক্ষকের প্রতি সম্মান শুধু কথায় নয়; আচরণেও তার প্রকাশ ঘটাতে হয়। এই ছোট্ট ঘটনাটির মধ্যে লুকিয়ে আছে একটি বড় শিক্ষা|একজন মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার কারিগর যিনি, তাঁর মর্যাদা কোনো পদ-পদবি কিংবা সম্পদের সঙ্গে তুলনীয় নয়।

আমি যখন শিক্ষার্থী ছিলাম, সে সময়টা খুব বেশি দিনের আগের কথা নয়। ২০০৪ সালে আমি এসএসসি পরীক্ষার্থী। সময়ের ব্যবধানে আজ আমি নিজেই একজন শিক্ষক। তাই শিক্ষার্থীজীবনের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে বর্তমান সময়ের সঙ্গে তুলনা না করে পারি না। আমাদের সময়ে শিক্ষক শব্দটির সঙ্গে দুটি বিষয় গভীরভাবে জড়িয়ে ছিল শ্রদ্ধা ও ভয়। শিক্ষককে দেখলে স্বাভাবিকভাবেই মাথা নত হয়ে আসত। শিক্ষকের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সময়ও মনে হতো কোনো ভুল শব্দ উচ্চারণ করছি না তো!
শুধু শিক্ষার্থী নয়, অধিকাংশ অভিভাবকের মনেও শিক্ষকের প্রতি ছিল অগাধ আস্থা। তাঁরা অনেক সময় শিক্ষককে বলতেন, স্যার, আমার ছেলে/মেয়েকে আপনার কাছে দিয়ে গেলাম। পড়া না পারলে কিংবা কোনো ধরনের বেয়াদবি করলে- মাংস আপনার, হাড় আমার।” কথাটি শুনতে আজ হয়তো কঠোর মনে হতে পারে। কিন্তু এর ভেতরে একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল—অভিভাবক তাঁর সন্তানের শিক্ষার দায়িত্ব শিক্ষকের হাতে তুলে দিতেন এবং শিক্ষকের সিদ্ধান্তের ওপর আস্থা রাখতেন। আমি তখন অষ্টম কিংবা নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। আমাদের সমাজবিজ্ঞান পড়াতেন প্রিয় মানিক স্যার। একদিনের ঘটনা আজও বেশ মনে পড়ে। সেদিন সমাজবিজ্ঞান ক্লাসে অধিকাংশ শিক্ষার্থী নির্ধারিত পড়া সম্পূর্ণ করে আসেনি। বিষয়টি স্যারের চোখে পড়তেই তিনি প্রচণ্ড রেগে গেলেন। আমাদের সময়ের প্রচলিত কঠোর শাসনের অংশ হিসেবে সেদিন তিনি শিক্ষার্থীদের বেত্রাঘাত করেছিলেন। এমন পরিস্থিতি হয়েছিল যে, শাস্তি পাওয়ার পর অনেকের শরীর-মনে যেন জ্বর এসে গিয়েছিল!
আজকের দৃষ্টিতে সেই শারীরিক শাস্তিকে অবশ্যই সমর্থন করার সুযোগ নেই। তবে সেই সময়ের আরেকটি দিকও অস্বীকার করার উপায় নেই শিক্ষকের শাসন নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক ঐকমত্য ছিল। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, সেদিন কোনো শিক্ষার্থী বাড়িতে গিয়ে বাবা-মায়ের কাছে অভিযোগ করার সাহস পেত না।
কারণ আমরা জানতাম, বাবা-মা যদি জানতে পারেন যে শিক্ষক শাস্তি দিয়েছেন, তাহলে তাঁরা উল্টো হয়তো বলবেন- পড়া পারিসনি, নাকি স্যারের সঙ্গে বেয়াদবি করেছিস? অর্থাৎ, তখন সন্তান শিক্ষককে নিয়ে অভিযোগ করলে অভিভাবক প্রথমে শিক্ষকের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেন না; বরং সন্তানকে প্রশ্ন করতেন- তোমার ভুলটা কোথায়? কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে পরিবার, সমাজ, প্রযুক্তি এবং শিক্ষাব্যবস্থার পরিবেশ। সবচেয়ে বেশি বদলেছে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক। আজ কোনো শিক্ষার্থী পড়া না পারলে তাকে প্রশ্ন করা হলে অনায়াসে বলে-মন চায়নি, তাই পড়িনি। শিক্ষক একটু কঠোরভাবে কথা বললে কেউ কেউ পাল্টা যুক্তি দেয়। কখনো অভিভাবকের কাছে অভিযোগ যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষকের সঙ্গে এমন আচরণও করা হয়, যা একসময় কল্পনাও করা যেত না।
বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষক লাঞ্ছিত হওয়ার খবর আমাদের সামনে আসে। প্রশ্ন হলো এই জায়গায় আমরা কীভাবে এসে দাঁড়ালাম? একজন শিক্ষক, যিনি একটি শিশুকে অক্ষরজ্ঞান থেকে শুরু করে জীবনের পথ চিনতে সাহায্য করেন, সেই শিক্ষকই যখন তার শিক্ষার্থীর কাছে অপমানিত হন, তখন শুধু একজন শিক্ষক অপমানিত হন না অপমানিত হয় শিক্ষা, শৃঙ্খলা এবং আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ।
তবে এ সমস্যার দায় কি শুধু শিক্ষার্থীর?
নিশ্চয়ই নয়।
পরিবার কি তার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছে? একটি শিশুর প্রথম বিদ্যালয় হলো তার পরিবার। সে কীভাবে কথা বলবে, বড়দের কীভাবে সম্মান করবে, ভুল করলে কীভাবে ক্ষমা চাইবে, দায়িত্ব কী—এসব শিক্ষা বই থেকে নয়, পরিবার থেকেই প্রথম শেখে। কিন্তু আমরা কি সবসময় সন্তানকে সেই শিক্ষা দিচ্ছি?
সন্তান পরীক্ষায় কত পেল—এটি নিয়ে আমরা যতটা চিন্তিত, সে কার সাথে কীভাবে কথা বলল, শিক্ষককে সম্মান করল কি না, দুর্বল বন্ধুর পাশে দাঁড়াল কি না—এসব নিয়ে কি ততটাই ভাবি?
অনেক সময় সন্তান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে আমরা ঘটনার সত্যতা যাচাই না করেই শিক্ষকের কাছে ছুটে যাই। এতে সন্তান হয়তো সাময়িকভাবে খুশি হয়, কিন্তু তার মনে একটি বিপজ্জনক ধারণা জন্ম নেয়- আমার কোনো ভুল হলেও আমাকে কেউ কিছু বলতে পারবে না।
এই মানসিকতা ভবিষ্যতে শুধু বিদ্যালয়েই নয়, পরিবার ও সমাজেও সমস্যার কারণ হতে পারে।
শিক্ষার উদ্দেশ্য কি আমরা ভুলে যাচ্ছি? আজকের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই। আমরা শিক্ষাকে ক্রমেই পরীক্ষার নম্বর, জিপিএ, সার্টিফিকেট ও চাকরির সঙ্গে যুক্ত করে ফেলেছি। শিক্ষার্থী কত নম্বর পেল এটাই যেন শিক্ষার প্রধান মানদণ্ড।
কিন্তু শিক্ষা কি শুধু নম্বর?
একজন শিক্ষার্থী যদি
ভালো ফল করে, কিন্তু অন্যকে সম্মান করতে না শেখে, সত্য কথা বলতে না শেখে, দায়িত্ব নিতে না শেখে, শিক্ষককে সম্মান না করে, বাবা-মায়ের সঙ্গে অসদাচরণ করে—তাহলে তাকে কি আমরা প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত বলতে পারি?
শিক্ষার সবচেয়ে বড় সাফল্য একজন ভালো ফলাফলকারী মানুষ তৈরি করা নয়; একজন নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ তৈরি করা।
তাহলে দায় কার?
এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই।
দায় শিক্ষার্থীর আছে, যদি সে জেনে-বুঝে শিক্ষকের সঙ্গে অসদাচরণ করে। দায় অভিভাবকের আছে, যদি সন্তানকে শুধু ফলাফল শেখান কিন্তু মূল্যবোধ শেখাতে ভুলে যান। দায় শিক্ষকেরও আছে, যদি তিনি দায়িত্বে অবহেলা করেন বা শিক্ষার্থীর সঙ্গে অমানবিক আচরণ করেন। আর দায় আমাদের সমাজেরও আছে, যদি আমরা শিক্ষকের মর্যাদা নিয়ে শুধু বক্তৃতা করি, কিন্তু বাস্তবে সেই মর্যাদা রক্ষায় ভূমিকা না রাখি।
এখনই সময় ফিরে তাকানোর। আমরা এমন একটি প্রজন্ম চাই, যারা শুধু পরীক্ষায় ভালো করবে না; নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষও হবে। যে শিক্ষার্থী শিক্ষকের চোখে চোখ রেখে কথা বলবে, কিন্তু অসম্মান করবে না।
যে শিক্ষক শিক্ষার্থীকে শাসন করবেন, কিন্তু অপমান করবেন না।
যে অভিভাবক সন্তানের পাশে দাঁড়াবেন, কিন্তু অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবেন না। আর এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা চাই, যেখানে শিক্ষক সম্মানের সঙ্গে শিক্ষকতা করবেন এবং শিক্ষার্থী আনন্দ ও নিরাপত্তার সঙ্গে শিখবে।
কারণ-
শিক্ষককে ছোট করে শিক্ষার বড়ত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
শিক্ষার্থীকে ভয় দেখিয়ে প্রকৃত শিক্ষা দেওয়া যায় না। আর সার্টিফিকেট দিয়ে নৈতিকতার ঘাটতি পূরণ করা যায় না। আজ আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি শুধু পরীক্ষার্থী তৈরি করব, নাকি ভালো মানুষ তৈরি করব?
কারণ আগামী দিনের বাংলাদেশ কেমন হবে, তার উত্তর লুকিয়ে আছে আজকের শ্রেণিকক্ষে।
তাই পরিবর্তনের দায়ও সবার। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও রাষ্ট্র সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে। নইলে একদিন হয়তো আমাদের হাতে থাকবে অসংখ্য সার্টিফিকেট, কিন্তু হারিয়ে যাবে সেই জিনিসটি, যার জন্য শিক্ষার এত আয়োজন- মানুষ।
লেখক: স্কুলশিক্ষক, কলামিস্ট।
বাসাইলসংবাদ, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ /একেবি
সকলের অবগতির জন্য নিউজটি শেয়ার করুন




