
নিউজ ডেস্ক : দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট বলয়ে আটকে থাকা বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি সর্বশেষ নিজের পছন্দে ঘোষণা করেছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ কমিটির কাছ থেকে পাহাড়সম প্রত্যাশা থাকলেও সাংগঠনিকভাবে এটি ছিল অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। উপরন্তু সদলবলে অর্থের পেছনে হন্যে হয়ে ছোটার অভিযোগ ছিল কমিটির শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প, চাকরির তদবির, টেন্ডারবাজিসহ কমিটি বাণিজ্যের অভিযোগও রয়েছে সর্বশেষ কমিটির শীর্ষ দুই নেতার বিরুদ্ধে। এমনকি শাহবাগের ফুল মার্কেট থেকে শুরু করে নিউ মার্কেটের টেম্পুস্ট্যান্ড পর্যন্ত সব ব্যবসা থেকেই চাঁদাবাজি চালাতেন নেতাদের মনোনীতরা। ২০১৮ সালের ১১ ও ১২ মে নতুন নেতৃত্বের ঘোষণা না দিয়ে শেষ হয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সম্মেলন। এর প্রায় দুমাস পর, গত বছরের ৩১ জুলাই ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে গোলাম রাব্বানীর নাম ঘোষণা করা হয়। ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নাম ঘোষিত হওয়ার পর থেকেই এ দুই নেতাকে ঘিরে তৈরি হয় একটি বিশেষ সিন্ডিকেট। এ সিন্ডিকেটের বলয় থেকে বের হতে পারেননি শোভন ও রাব্বানী। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা জানান, সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর অবৈধ অর্থ উপার্জনে প্রধান ভূমিকা পালন করতেন সহসভাপতি তানজিল ভূইয়া তানভীর।

বিভিন্ন স্থানে টেন্ডার, কমিটি বাণিজ্যসহ অবৈধ কর্মকান্ডে নিয়ামক ছিলেন তিনি। তবে টেন্ডার বাণিজ্যর ক্ষেত্রে রাব্বানীর আপন মামা শাখাওয়াতও সমানতালে ভূমিকা রাখতেন। তিনি বিভিন্ন তদবির, টেন্ডার, ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। এসব অপকর্মের সহযোগী ছিলেন সেনাবাহিনীর সৈনিক পদ থেকে চাকরি ছেড়ে আসা টিটু নামে একজন, যিনি গোলাম রাব্বানীর বন্ধু। এর বাইরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সাবেক নেতা ও বর্তমান কমিটির উপদপ্তর সম্পাদক আব্দুল্লাহ বিন মুনশিও রাব্বানীর রাজনীতিতে ভূমিকা রাখতেন। অন্যদিকে সভাপতি শোভন সবচেয়ে নির্ভরশীল ছিলেন ছাত্রলীগের সোহাগ-নাজমুল কমিটির দুই নেতার ওপর। এর বাইরে বিভিন্ন স্থানে কমিটি বাণিজ্য, টেন্ডার ও চাকরির তদবিরের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতেন শোভনের আপন ছোট ভাই ও ছাত্রলীগের আন্তর্জাতিক সম্পাদক রাকিনুল হক চৌধুরী ছোটন। এ ছাড়া সংগঠনটির সহসভাপতি ফুয়াদ হাসানসহ আরও কয়েকজন নেতা তদবির ও পদবাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরও সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন শোভন ও রাব্বানী। কিন্তু ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই আমূল পাল্টে যায় তাদের জীবনযাপন। দামি গাড়ি, আলিশান ফ্লাট যোগ হয় তাদের যাপিত জীবনে। শোভন আগে হাজী মুহা. মুহসীন হলে থাকলেও নেতা হওয়ার পর আলিশান বাসা ভাড়া নেন কাঁঠালবাগানে। ৭০ হাজার টাকা ভাড়ার এ বাসা সাজানো হয় দামি সব আসবাবপত্রে।
অন্যদিকে গোলাম রাব্বানী সাধারণ সম্পাদক হওয়ার আগে মোতালেব প্লাজার ছোট একটি ফ্লাটে থাকলেও পরবর্তীকালে ওই ভবনেরই ১৫ তলায় আড়াই হাজার বর্গফুটের বিশাল ফ্ল্যাট ভাড়া নেন তিনি। শুরুতে এ ফ্ল্যাটটির বিপরীতে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ভাড়া দিতেন। পরে এটি নিজের নামে কিনে নেন। যদিও গোলাম রাব্বানী বলছেন, ফ্লাটটি তার বাবা কিস্তিতে কিনেছেন। ৬০ কিস্তিতে কেনা এ ফ্লাটের মাত্র দশ কিস্তি দেওয়া হয়েছে।
জানা যায়, ছাত্রলীগের সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর গোলাম রাব্বানী ব্যক্তিগতভাবে দামি দুটি ব্র্যান্ডের গাড়ি ব্যবহার শুরু করেন। তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে থাকা তানজিল ভূইয়া তানভীর ও তৌফিকুল হাসান সাগরও দামি গাড়ি হাঁকাতে শুরু করেন। ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে জিএস নির্বাচিত হন গোলাম রাব্বানী। এর পর ছয় মাস পার হতে চললেও শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যা সমাধানে তার কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি, যা পূরণে তিনি নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু ডাকসুর অন্য নেতাদের রুমে এসি না থাকলেও তার কক্ষে এটি স্থাপন করা হয়।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রাকিবুল ইসলাম রাকিবের ৭ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের একটি অডিও ক্লিপে শোনা যায়, ৪০ লাখেরও বেশি টাকার বিনিময়ে তিনি নেতা হয়েছেন। এমনকি ওই টাকা আগামী ছয় মাসে ডাবল হয়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। ওই কথোপকথন থেকে জানা যায়, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পাবিপ্রবি) মাহমুদুল হাসান নামে ছাত্রলীগের এক কর্মীকে নেতা বানানোর পরিকল্পনা করা হয়। তাকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর মাধ্যমে পাবিপ্রবির নেতা বানানো যাবে বলে জানান রাকিব। কারণ রাব্বানী তাকে আঞ্চলিক নেতা বানানোর দায়িত্ব দিয়েছেন। এর বাইরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক শেখ জয়নুল আবেদিন রাসেলও টাকা চাওয়ার অভিযোগ করেছেন গোলাম রাব্বানীর বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ দেওয়া ও মাসিক ভিত্তিতে টাকা দিলে তাদের বহিষ্কার করা হবে না বলে গোলাম রাব্বানী জানিয়েছিলেন। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প ও বৈশাখি কনসার্টের ভাগবাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতাই। এদিকে খুলনা জেলার কয়রা উপজেলার কমিটিতেও টাকা লেনদেনের কয়েকটি অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়েছে। এতে উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতির চাচা পরিচয়ে একজন বলেন, কমিটি আনতে বিপুল পরিমাণ টাকা খরচ হয়েছে। এর পর মাসে মাসে টাকা দিতে হয়। এর বাইরে বিভিন্ন মাদক দেওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়। এ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত টিঙ্কু পরিচিত শোভনের অনুসারী হিসেবে। এদিকে শোভন ছাত্রলীগের সভাপতি হওয়ার পর নতুন মডেলের গাড়ি ব্যবহার শুরু করেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শোভন টয়োটা স্কোয়ার হাইব্রিড গাড়িটি সার্বক্ষণিক ব্যবহার করেন। তার ছোট ভাই রাকিনুল হক চৌধুরী ছোটনও একই ধরনের কালো কালারের একটি গাড়ি ব্যবহার করেন। যদিও শোভন এ গাড়ি তার নয় বলে দাবি করেন। এদিকে গোলাম রাব্বানীর রাজধানীর হাতিরপুলে রয়েছে খুবই আলিশান অফিস। রাব্বানীর অনুসারীদের কাছে যা পুল ক্লাব নামে পরিচিত। এ অফিসে উন্নতমানের সেলুনের পাশাপাশি রয়েছে পুল খেলার সুবিধাও। গোলাম রাব্বানী তার ঘনিষ্ঠজনদের নিয়ে এখানে পুল খেলেন। তার এ অফিসেই ব্যবসায়িক আলাপ-আলোচনা ও বাণিজ্য হয়ে থাকে। শাহবাগের ফুল মার্কেট থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করতেন গোলাম রাব্বানীর অনুসারীরা। একই সঙ্গে নীলক্ষেতের টেম্পুস্ট্যান্ডেরও দখল নেন তারা। সম্প্রতি চাঁদা না দেওয়ায় শাহবাগ ফুল মার্কেট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদকে মারধর করেন গোলাম রাব্বানীর আস্থাভজন হিসেবে পরিচিত কেন্দ্রীয় কমিটির নাট্য ও বিতর্ক সম্পাদক জুয়েল মোল্লা। এ নিয়ে চাঁদা দাবির একটি অডিও ভাইরাল হয়। এ ছাড়া নীলক্ষেতের টেম্পুস্ট্যান্ডেও চাঁদা বসিয়েছেন তিনি। এ নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাদের সঙ্গে বেশ কয়েক দফায় তার স্নায়ুযুদ্ধে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সূত্র জানায়, শাহবাগ ও নীলক্ষেত থেকে দৈনিক আট থেকে দশ হাজার টাকা চাঁদা তোলা হয়। এ টাকার উল্লেখযোগ্য একটি অংশ পান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সম্পাদক। এ দুই স্থানে চাঁদাবাজির বিষয়টি ওপেন সিক্রেট হলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এতদিন। সর্বশেষ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প বাবদ ৮৬ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়, যে ইস্যুতে কাদা ছোড়াছুড়ির জেরে শেষ পর্যন্ত তা প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত গড়ায়। সূত্র- দৈনিক আমাদের সময়




