
বাসাইলসংবাদ: মঙ্গলবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯:

এনায়েত করিম বিজয় :
জাহালম এখন আলোচিত ব্যক্তি। সবার মুখে মুখে জাহালম। জাহালম হতদরিদ্র পরিবারের হয়েও কি কারণে আলোচিত হয়েছেন এটি সবারই জানা। এই খামখেয়ালীপনা মামলায় বিনা অপরাধে তার জীবন থেকে তিনটি বছর কেড়ে নিয়েছে দুদক। দুদক কর্মকর্তাদের ভুলের মাশুল দিতে হয়েছে এই পাটকল শ্রমিক জাহালমকে। দুদকের ভুল নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে মূল আসামী আবু সালেককে বাদ দিয়ে এই জাহালমকে ফাঁসানো হয়েছে, সেই আলোচনাও এখন দেশ ব্যাপী। এই তিনটি বছরে জাহালমের পরিবার ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। তিনি ক্ষতিপূরণ পাবে কিনা সেই আলোচনা এখন তুঙ্গে।
বিগত তিন বছর দুর্নীতি দমন কমিশনের ভুলে নিরীহ জাহালম তার স্ত্রী, সন্তান ও পরিবার-পরিজনের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। তথ্য উপাত্তের কোনও রকমের মিল না থাকার পরও শুধুমাত্র ছবির মিলের কথিত ধারণা থেকে তাকে কারাবন্দি রাখা হয়েছিল। হাইকোর্টের নির্দেশনায় তার মুক্তি মানবিকতার ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
জাহালম টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার ধুবড়িয়া গ্রামের ইউসুফ আলীর ছেলে। তার রয়েছে একটি পুরনো একচালা ঘর। আনুমানিক ৮ বাই ১০ ফুট আকারের সেই ঘরটির অবস্থাও খুব জীর্ণ। ভেতরে আসবাবপত্রও তেমন কিছু নেই। একটি মাত্র চৌকি। সেখানেই নিজের স্ত্রী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে অবস্থান করছেন জাহালম। এর আগে ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত এই ঘরেই পরিবারসহ থাকতেন তিনি।

জাহালম তার স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে
আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় আব্দুল বারী নামের একজন ধনাঢ্য ব্যক্তির বাড়িতে প্রায় ত্রিশ বছর ছিলেন জাহালমের বাবা-মা। পরে জাহালমসহ তার ছয় ভাইবোন বড় হয়ে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে নিজেরা অল্প কিছু করে ২০১২ সালে ১০ শতাংশ জমি কেনেন তারা। ২০১৩ সালে সেখানে একটি একচালা ঘর বানান জাহালম।
সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আবু সালেক নামে এক ব্যক্তির নামে ৩৩টি মামলা দেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আসামি আবু সালেক কিন্তু তার বাড়ির ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন জাহালমের ঠিকানা। পরে সেই অর্থ আত্মসাতের মামলায় ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় দুদকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে জাহালমের বাড়ির ঠিকানায় চিঠি দেয় দুদক। জাহালম সেসময় নরসিংদীর ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুট মিলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন। নির্দিষ্ট দিনে দুদকে হাজিরা দিয়ে জাহালম আবার তার নরসিংদীতে জুট মিলের কর্মস্থলে চলে যান। এর দুই বছর পর ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর ঘোড়াশালের ওই জুট মিল থেকে জাহালমকে গ্রেফতার করে নাগরপুর থানায় আনা হয়। পরদিন তাকে টাঙ্গাইলের আদালতে তোলা হলে জেলখানায় পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক। ৭ দিন টাঙ্গাইল কারাগারে রাখার পর তাকে কাশিমপুর-২ কারাগারে নেওয়া হয়। এরপর থেকে তিন বছর সেখানে কারাবন্দি ছিলেন জাহালম। সম্প্রতি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর ভুল মামলায় তাকে গ্রেফতারের বিষয়টি নজরে আসায় গত রবিবার (৩ ফেব্রুয়ারি) হাইকোর্ট তাকে মুক্তির নির্দেশ দেন। পরে রবিবার মধ্যরাতে তাকে মুক্তি দেয় কারা কর্তৃপক্ষ। মুক্তি পেয়ে টাঙ্গাইলের নিজের বাড়িতে চলে যান জাহালম।

জাহালমের একচালা ঘর।
তদন্তের সময় দুদকের কর্মকর্তারা জাহালমের বাড়িতে গেলে অর্থনৈতিক অবস্থা দেখেই প্রকৃত ঘটনা বুঝতে পারতেন। তাহলে আর এই ভুল হতো না দুদকের। এই পাটকল শ্রমিক জাহালমকে ক্ষতিপূরণের জোর দাবি জানিয়েছেন টাঙ্গাইলবাসী।
তিনটি বছর জাহালম জেলখানায় যে বঞ্চনার শিকার হয়েছেন, তাতে দুদুক কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাকে ১০ কোটি টাকা দেওয়ার দাবি জানান সচেতনমহল।
এদিকে গত ৯ ফেব্রুয়ারি সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন নামের একটি সংগঠন জাহালমকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১০ কোটি টাকা দেওয়ার দাবিতে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে মানবন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।
লেখক: সংবাদকর্মী
বাসাইলসংবাদ/একেবি




