
নজরুল ইসলাম নাহিদ :

সিরাজ সাহেব থাকেন ঢাকায়, ওনার নিজের এক ঔষধের ফার্মেসী আছে, করেন পাইকারি ধরে বেচাকেনা, কাস্টমার ও বেশ তাই বেচাকেনাও। জমজমাট। বাসায় ওনার স্ত্রী ,দুই ছেলে, আর এক মেয়ে সব মিলিয়ে পাঁচজন সদস্য। হঠাৎ করেই ওনার জ্বর ,হালকা ঠান্ডা ও কাশিও আছে বেশ, নিজে নিজেই ঔষধ খেয়েছেনও বটে, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। কোন উপায় না পেয়ে পরিচিত একজনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে করোনা টেস্ট করার জন্য স্যাম্পল দিয়েছেন। তিন দিন পরে রিপোর্ট পাবেন বলে ওনাকে অপেক্ষা করতে বলেছেন তিনি। অপেক্ষা যেন আর শেষ হবার নয়, তিন দিন পর রিপোর্টও পেলেন রিপোর্ট দেখে মহা খুশি কারণ রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। আর ওখান থেকে বলে দিয়েছেন কোনো সমস্যা নেই জ্বর, ঠান্ডা, কাশির, ঔষধ খেয়ে যান কয়েকদিন পর ভালো হয়ে যাবে। উনিও তাই করে যাচ্ছিলেন কিন্তু হায়! এর পরের দিন থেকেই ওনার স্ত্রী , ছেলে, মেয়েরও একই সমস্যা শুরু হয়েছে।
কি করবেন ভেবে না পেয়ে এক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শে অন্য হাসপাতাল গিয়ে পাঁচ সদস্যের সবাই করোনা টেস্টের জন্য পুনরায় স্যাম্পল দিলেন। আবারো সেই অপেক্ষার পালা, অপেক্ষা শেষে রিপোর্টও পেয়েছেন। এবার রিপোর্ট পেলেন প্রথম রিপোর্ট এর বিপরীত মানে সবারই করোনা পজিটিভ, তারমানে প্রকৃত পক্ষে তিনি করোনা আক্রান্ত কিন্তু প্রথম রিপোর্ট এসেছে নেগেটিভ। তাহলে প্রথম যে রিপোর্টি দিয়েছে সেই রিপোর্টি ভুল, তার মানে False Neagtive , আসলে এটি মারাত্মক ভুল, চিকিৎসা ব্যাবস্থাপনায় এটি একটি অমার্জনীয় ভুল। আর এই ভুলের জন্য মাশুল দিতে হয়েছে তার পুরো পরিবারসহ তার দোকানের কাস্টমারের। তাই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে পরিবারের সদস্য ও দোকানের কাস্টমারসহ সবার মাঝেই । মাঝে মাঝে এমন হয় প্রকৃত পক্ষে ভাইরাসটি রুগির মধ্যে নেই কিন্তু টেস্ট করার পর রিপোর্ট এ যখন দেখা যায় পজিটিভ তার মানে এটিই হলো “False Positive “যেটি চিকিৎসা ব্যাবস্থাপনায় আরেকটা ভুল যার মাশুল দিতে হয় রুগিকে। দুটি রিপোর্টই কাম্য নয় কিন্তু Fasle Positive এর চেয়ে False Negative বেশি খারাপ বেশি মারাত্মক। যার জন্য রুগিসহ আশপাশের লোকদেরও মাশুল দিতে হয়।
নির্ভুল রেজাল্ট পেতে হলে অবশ্যই স্টান্ডার্ট টেস্ট পদ্দতি অবলম্বন করতে হবে যেমন যে বা যারা স্যাম্পল কালেকশন করছে তারা অভিজ্ঞ কিনা অথবা প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত কি না। শরীরের যে জায়গা থেকে স্যাম্পল কালেকশন করার কথা সেখান থেকে কালেকশন করছে কিনা, স্যাম্পল কালেকশন এর জন্য যে জিনিস গুলি দরকার হুবুহু তাহা আছে কি না অথবা ঠিক আছে কিনা। স্যাম্পল সংরক্ষণের জন্য যে তাপমাত্রা দরকার তা বরাবর আছে কি না, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টেস্ট করছে কি না, যে মেথডে টেস্ট করা হচ্ছে যেমন রিয়েল টাইম পিসিআর অথবা কীট অথবা অন্য কোনো মেথড এ এন্টিজেন বা এন্টিবডি টেস্ট করলে রেজাল্ট এর accuracy বা নির্ভুলের এর পার্সেন্টেজ কত এসব বিষয়ে বিশেষ ভাবে নজর দিতে হবে।
রুগ নির্ণয় করা যত নির্ভুল হবে রুগিকে চিকিৎসা দেওয়াটা ততই সহজ হবে এবং রুগিও দ্রুত সুস্থ হবে কিন্তু রুগই যদি নির্ভুলভাবে ধরা না যায় চিকিৎসা দেওয়া জটিল হয়ে পরে। ব্যাপারটা এরকম সর্বাঙ্গে ব্যাথা ঔষুধ দিবে কোথা।
বিশ্বের অন্যান্য উন্নত দেশের মতো বাহরাইনেও হাসপাতাল তথা ল্যাবরেটরি সরাসরি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও এন এইস আর এ (ন্যাশনাল হেলথ রেগুলেটরি অথরিটি ) থেকে নিয়ন্ত্রণ হয়। যেমন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও এন এইস আর এ এর অনুমোদন ছাড়া ল্যাবরেটরিতে রুগ নির্ণয়ের জন্য মেশিনারিজ ঢুকানো বা ব্যবহার করা সম্ভব নয়। ল্যাব এ কর্মরত ডাক্তার, ল্যাব টেকনোলজিস্ট, ল্যাব টেকনিশান, মাইক্রোবায়োলোজিস্ট সবাইকে তাদের কোয়ালিফিকেশন অনুযায়ী লাইসেন্স নিতে হয়। তারা কি না চাইলেই এ দেশের নিয়ম অনুযায়ী ওই নির্দিষ্ট ল্যাব ছাড়া অন্য ল্যাব এ কাজ করতে পারবে না, এমনকি ল্যাব এর নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন মেশিনের কোয়ালিটিটি কন্ট্রোলসহ সমস্ত কাজ ঠিক মতো হচ্ছে কি না তা দেখার জন্য হটাৎ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও এন এইস আর এ পরিদর্শনে আসেন। পূঙ্খানু পুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ করেন এমনকি তারা প্রতিটি ল্যাব এর জন্য আলাদা আলাদা কন্ট্রোল স্যাম্পল সরবরাহ করে থাকেন।
যার মান তাদের জানা আর এই জানা মানের সাথে যদি ল্যাব এর মান না মিলে তাহলে তদন্ত পূর্বক ল্যাবের সমস্ত কার্যক্রম স্থগিত করে দেন। তার মানে এই নিয়মের মধ্যে থেকে কাজ করে গেলে কোনো ভাবেই ল্যাব থেকে ভুল রিপোর্ট যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না।
আজ করোনা সারা বিশ্বকে যে ভাবে লন্ড ভন্ড করে দিয়েছে কাল অন্য কোনো ভাইরাস যে হানা দিবে না কে বলতে পারে, সময়ের সাথে বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে তাই আমাদের উচিত বিশ্বের উন্নত দেশ সমূহকে অনুসরণ করে এগিয়ে যাওয়া। ,মালয়েশিয়ার প্রধান মন্ত্রী মাহাথির মুহাম্মদ বলেছিলেন যে দেশের বিত্তশালীরা দেশের বাহিরে চিকিৎসা নিতে যান বুজতে হবে তার নিজের দেশের চিকিৎসা ব্যাবস্থার প্রতি তার আস্থা নেই। তাই যারা ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কালো টাকার অহংকারে একটু জ্বর ,ঠান্ডাতেই দেশের বাহিরে গিয়ে নিজের দেশের টাকা আরেক দেশে খরচ করে আসতেন, আজ আপনারা কোন দেশে যাবেন? তাই আজ সময় এসেছে দেশের কথা চিন্তা করার, দেশ নিয়ে ভাবার, দেশের জন্য কিছু করার, সময় এসেছে নিজের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত করে গণহারে পাশের দেশ ইন্ডিয়াসহ অন্যান্য দেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বন্ধ করে নিজের দেশের টাকা নিজের দেশেই রাখার।
লেখক : (মাইক্রোবায়োলোজিস্ট), ল্যাব, ইনচার্জ,
লিন্নাস মেডিকেল সেন্টার. মানামা, কিংডম অফ বাহরাইন।




