
বাসাইলসংবাদ: মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ, ২০১৯:

নিউজ ডেস্ক : মধুমতির কোলঘেঁষে দক্ষিণাঞ্চলের এক অজপাড়া গাঁ, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্ম করে খোকা নামে একটি শিশু। কালক্রমে এই খোকা হয়ে ওঠেন বাংলার মহানায়ক। তিনি আর কেউ নন। তিনি বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি বঙ্গবন্ধু। তিনি জাতির পিতা। পুরোজীবন তাঁর কেটেছে বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ে। আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য। সারাজীবন ধরে চেয়েছেন বাঙালির জন্য পৃথক আবাসভূমি বাংলা নামক দেশের জন্য। গভীর দেশপ্রেম, সীমাহীন আত্মত্যাগ ও অতুলনীয় নেতৃত্বে তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা। তার বীরত্বপূর্ণ নেতৃত্বে একটি দেশ স্বাধীন হয়েছে।
পিতার নাম শেখ লুৎফর রহমান, মাতা সায়েরা খাতুন। বঙ্গবন্ধু পিতা-মাতার তৃতীয় সন্তান। পরিবারের সবাই ‘খোকা’ নামে ডাকতেন। শেখ পরিবারের আদরের ছোট্ট খোকা একদিন হয়ে ওঠেন বিশ্বনন্দিত নেতা, আবির্ভূত হয়েছিলেন স্বাধীনতা চেয়ে নির্যাতিত-নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর ত্রাণকর্তা হিসেবে।
শেখ পরিবারের আদরের ছোট্ট খোকা প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন ১৯২৭ সালে স্থানীয় গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুল ও গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুলে পড়ালেখা করেন। ১৯৪২ সালে এন্ট্রান্স (এসএসসি) পাস করার পর তিনি ভর্তি হন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে। সেখান থেকে ১৯৪৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিএ পাস করেন এবং দেশ বিভাগের (ব্রিটিশের কাছ থেকে ভারত-পাকিস্তান আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে ভাগ হয়েছিল) পর ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন।
ছোটবেলা থেকেই খোকা ছিলেন ক্রীড়াপ্রেমী, সাহসী, বুদ্ধিমান, প্রতিবাদী, গরিব-অসহায় মানুষের প্রতি সংবেদনশীল এবং রাজনীতি সচেতন। স্কুলের ছাত্রত্বকালীন সময়ে তিনি দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। মুষ্টি ভিক্ষার চাল উঠিয়ে গরিব ছেলেদের বই এবং পরীক্ষার খরচ বহন করা, বস্ত্রহীন পথচারী শিশুকে নিজের নতুন জামা পরিয়ে দিতেও তিনি কার্পণ্য করতেন না। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের দায়িত্ব নেয়ার মতো মহৎ গুণ শক্তভাবেই ধারণ করেছিলেন সেই শৈশবেই।
১৯৪৮ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ’৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধ, এমন কোন আন্দোলন নেই যেটাতে সামনে থেকে তিনি নেতৃত্ব দেননি। বঙ্গবন্ধু বাংলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন। প্রতিটি বাঙালির কাছে পৌঁছে দিয়েছেন পরাধীনতার শিকল ভাঙার মন্ত্র। রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে বঙ্গবন্ধু প্রমাণ করেছিলেন তার পক্ষেই সম্ভব স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন। তারপর থেকে প্রতিটি আন্দোলন আর সংগ্রামে বাঙালির মুক্তির দূত হিসেবে আপসহীন নেতৃত্ব দেন তিনি। ’৫৪-এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে শেখ মুজিবের রাজনৈতিক বিচক্ষণতায় অভিভূত দেশবাসী স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া আওয়ামী লীগ পরিণত হয় জনগণের একমাত্র আস্থার রাজনৈতিক দল হিসেবে। অসাম্প্রদায়িক চেতনা আর প্রগতির পতাকা হাতে নিয়ে বঙ্গবন্ধু পরিণত হন জাতীয় রাজনীতির প্রধান নেতা হিসেবে। ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলনের মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধু জাতিকে নিয়ে যান স্বাধীনতার স্বপ্নের দ্বারপ্রান্তে। বারবার কারা নির্যাতিত নেতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সফল হয় ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান। এরপর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম। ১৯৭১ এর ৭ই মার্চ মঞ্চ কাঁপিয়ে বঙ্গবন্ধু শোনালেন ৭ কোটি বাঙালির হৃদয়ের অমর-কবিতা:
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম৷’
শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর ত্রিশ লাখ শহীদের বিনিময়ে অর্জিত হয় আমাদের স্বপ্নের স্বাধীনতা।
মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও অন্যান্য আন্দোলন করতে গিয়ে তিনি বার বার জেল খেটেছেন। ফাঁসির মঞ্চে নিয়েও তাকে মারতে পারেনি পাকিস্তানিরা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর রাজনৈতিক জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাভোগ করেছেন। এর মধ্যে স্কুলের ছাত্র অবস্থায় ব্রিটিশ আমলে সাত দিন কারা ভোগ করেন। বাকি ৪ হাজার ৬৭৫ দিন তিনি কারাভোগ করেন পাকিস্তান সরকারের আমলে।
শেখ মুজিবুর রহমানকে তার কাছের সবাই ডাকতেন মুজিব ভাই বলে। এ নামেই তিনি পরিচিত ছিলেন বন্ধু, নেতা, কর্মী সবার কাছে। ১৯৬৮ সালের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কারাবরণ করেন তিনি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি পাবার পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১০ লাখ লোকের এক বিশাল জনসভায় ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমদ তাকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করেন। সেদিন থেকে তিনি আর শেখ মুজিব বা নেতা-কর্মীদের মুজিব ভাই নন। বাঙালির প্রাণের নেতা বঙ্গবন্ধু।
সূত্র- বাংলার আলো
বাসাইলসংবাদ/একেবি




