
মোঃ আতিকুর রহমান (নাহিদ) :

# আমরা সাধারণত অসুস্থ হবার পরে ওষুধ খেয়ে থাকি, কিন্তু ভাইরাস ঘটিত রোগের ক্ষেত্রে ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হবার পূর্বেই ভ্যাক্সিন/টিকা নিতে হয়।
ভ্যাক্সিন/টিকা হলো যে ভাইরাস দ্বারা সংক্রমণ হয় সেই ভাইরাস এর নিষ্ক্রিয় অংশ বা সক্রিয় অংশ। টিকা তৈরি করা হয় ভাইরাস বা ভাইরাস দেহের অংশ বিশেষ দিয়েই। (আরও বিভিন্ন ফর্মুলেশনও আছে)
আপনার শরীরে টিকা দেওয়ার মানে হলো আপনার দেহে মূলত ভাইরাস (ভাইরাস এর নিস্ক্রিয় দেহাংশ) ই প্রবেশ করিয়ে দেওয়া হলো।
যেহেতু আপনার দেহে এটি বাইরে থেকে প্রবেশ করলো তাই দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এটিকে চিনতে পারে যে দেহে বহিরাগত কেউ এসেছে। সেই অনুযায়ী দেহের প্রতিরক্ষা সিস্টেম কাজ করতে শুরু করে, টিকা হিসেবে যে ভাইরাস/ভাইরাস এর দেহের অংশ বিশেষ দেহে প্রবেশ করলো তাকে মারার জন্য দেহে তখন এন্টিবডি তৈরি হওয়া শুরু হয়, একই সাথে দেহে তখন মেমোরি সেল/ স্মৃতি কোষ তৈরি হয়।
এখানে মূল জিনিসটা আসলে এই স্মৃতিকোষ।
আপনি যে ভাইরাস এর জন্য ভ্যাক্সিন নিয়েছেন, পরবর্তীতে আপনার দেহে পরিবেশ থেকে যদি কখনো উক্ত ভাইরাসটি প্রবেশ করে এই স্মৃতি কোষ তখন সেটিকে আপনার শরীরের জন্য ক্ষতিকর শত্রু হিসেবে চিনে ফেলে এবং সাথে সাথে এন্টিবডি তৈরিসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করে।
মোট কথা আগে থেকেই সুসজ্জিত সেনাবাহিনীর মতো প্রস্তুত থাকে বলে যখন উক্ত ভাইরাসটি দেহে প্রবেশ করে তখন তাকে মেরে ফেলে আপনাকে সুরক্ষিত রাখে। একবার ভ্যাক্সিন দিলে কত বছর পর্যন্ত এটি কাজ করবে ভ্যাক্সিনভেদে এটি আলাদা আলাদা।
যখন আপনি ভ্যাক্সিন নিলেন তখন শরীরে প্রতিরক্ষা সিস্টেম ভ্যাক্সিনেশনের ফলে আপনার দেহে যে ভাইরাস অংশটি প্রবেশ করলো সেটির সাথে যুদ্ধ করতে শুরু করে, তার লক্ষণ হিসেবে বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়। যে ভ্যাক্সিন এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যত কম সে ভ্যাক্সিন তত বেশি ভাল।।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়টা বিভিন্ন ফ্যাক্টরের উপর নির্ভর করে যেমন- মানুষের শারিরীক অবস্থা, বয়স ইত্যাদি। একই ভ্যাক্সিন নিয়ে কারও শরীরে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায় আবার কারও শরীরে দেখা যায় না। (বিষয়টা অনেকটা চিংড়ি মাছ/বেগুন খেলে কারও কারও যেমন এনার্জির সমস্যা হয়, কিন্তু সবার হয় না)।
ভ্যাকসিন নেয়ার পরে কারও কারও ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।
যেমন ভ্যাকসিন প্রয়োগের জায়গায় ফুলে লাল হয়ে যাওয়া, সামান্য জ্বর হওয়া, বমি বমি ভাব, মাথা ও শরীর ব্যাথা। এ লক্ষণগুলো দুই একদিন থাকতে পারে।
মোট কথা এমন কোন ভ্যাক্সিন নেই যেটা ১০০% পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন।
# যেহেতু ভ্যাক্সিন এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়টি রয়েছে তাই অতিবৃদ্ধ, গর্ভবতী মা, অপ্রাপ্ত বয়স্ক বাচ্চা কিংবা যাদের শরীরের এলার্জির সমস্যা আছে তারা প্রথম ধাপে টিকা না নেওয়াই ভাল। তবে অন্যান্যরা সাহস করে টিকা নিতে পারেন। এছাড়া সামনের দিনগুলোতে বিদেশে গমনের ক্ষেত্রে এই টিকা নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে হয়তো।
আর টিকা নিলে টিকাকেন্দ্রে ডাক্তার এর নির্দেশ মতো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও উচিত।
যদি কোন জটিলতা তৈরি হয়ে যায় তবে তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালে যোগাযোগ করা উচিত হবে।।
# বাংলাদেশে ভারত থেকে যে টিকা এসেছে সেটা অক্সফোর্ড-এস্ট্রোজেনেকার উদ্ভাবিত টিকা কোভিশিল্ড যেটা ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট ম্যানুফ্যাকচারিং করছে। এটা ভারতের উদ্ভাবিত কোন টিকা নয়, অক্সফোর্ড এর টিকার প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখানে উৎপাদন করা হচ্ছে মাত্র। উৎপাদন সক্ষমতার বিবেচনায় সেরাম ইন্সটিটিউট পৃথিবীর সবচেয়ে বড় টিকা ম্যানুফেকচারার। দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র সেরাম ইনস্টিটিউট ই অক্সফোর্ড এর টিকা উৎপাদন করছে। এখান থেকে সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে টিকা সাপ্লাই হয়।
বাংলাদেশে ভারতের উদ্ভাবিত যে টিকা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে সেটা মূলত ভারত বায়োটেক উদ্ভাবিত কোভ্যাক্সিন যেটি এখনো ট্রায়াল পর্যায়ে রয়েছে। এটি বাংলাদেশে আসে নাই, ভারত সরকার এটি বাংলাদেশে ট্রায়াল দেওয়া ইচ্ছে প্রকাশ করেছে মাত্র। বাংলাদেশ সরকার ট্রায়ালের কোন অনুমতি দেয়নি।
# সেরাম ইন্সটিটিউটে ম্যানুফেকচারকৃত কোভিশিল্ড এর যে ৩ কোটি ডোজ টিকা বাংলাদেশ কেনার চুক্তি করেছে তার প্রথম চালান ৫০ লাখ ডোজ টিকা গত ২৫ জানুয়ারি দেশে এসেছে, এভাবে প্রতিমাসে ৫০ লাখ করে ৬ মাসে ৩ কোটি ডোজ টিকা আসার কথা।
প্রথম ধাপে যে ২০ লাখ টিকা এসেছে তা এই ৩ কোটির অংশ নয়, ওটা ৩ কোটির বাইরে উপহার হিসেবে এসেছে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বাংলাদেশ এর পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমনঃ নেপাল (১০ লাখ), ভূটান(১.৫ লাখ), মালদ্বীপকে(১ লাখ) টিকা ভারত উপহার হিসেবে দিয়েছে।
ভ্যাক্সিনেশন কার্যক্রমের সফলতা কামনা করছি, গোটা পৃথিবীর মানুষ পুনরায় তাদের স্বাভাবিক জীবনে যেনো ফিরে যেতে পারে।
লেখক : সাবেক শিক্ষার্থী,
মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
বাসাইলসংবাদ/ ২৬ জানুয়ারি, ২০২১ /একেবি
সকলের অবগতির জন্য নিউজটি শেয়ার করুন




