
নিউজ ডেস্ক : ১৯৪৯ থেকে ২০২০। দীর্ঘ এক পথপরিক্রমা। শুরুটা হয়েছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে জন্ম নেওয়া পাকিস্তানে পূর্ববাংলার জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে। এরই ধারাবাহিকতায় আসে একাত্তর। অমোচনীয় এক ইতিহাসের জন্ম দিয়ে বিশ্বদরবারে উদিত হয় সবুজ জমিনে লাল সূর্যের নিশান, স্বাধীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র, বাংলাদেশ। এর নেতৃত্বে ছিল উপমহাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। একাত্তরের আগেই শুধু নয়, স্বাধীন বাংলাদেশেও অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, চড়াই-উতরাই ও সুদীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে আজকের অবস্থানে এসেছে আওয়ামী লীগ। গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারক এ দলটি আজ ৭১ বছর পেরিয়ে ৭২ বছরে পা দিয়েছে।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পুরান ঢাকার কেএম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ নানা ইতিপূর্বে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, অনৈতিক সিদ্ধান্ত, মতবিরোধসহ নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেই এতটা পথ এসেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাত ধরে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল; তার নেতৃত্বেই স্বাধীন দেশে উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রাও শুরু হয়েছিল। এর পর দীর্ঘ সময় প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে জাতির জনকের স্বপ্নের পথ ধরে তার কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শুরু হয় নতুনযাত্রা। বর্তমানে টানা তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আছে দলটি। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অর্থনৈতিক তথা সামগ্রিক বিবেচনায় দেশের ব্যাপক উন্নয়ন সত্ত্বেও কতিপয় নেতার লোভ, অনিয়ম ও দুর্নীতি দলের অর্জন ও উন্নয়নের অগ্রযাত্রাকেও প্রশ্নে ফেলে দেয়। এমতাবস্থায় দলের সভাপতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান চালাতে বাধ্য হন। গ্রেপ্তার হন বেশ কিছু নেতাও।
অন্যদিকে বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ সংক্রমণকালেও ত্রাণ আত্মসাৎ, বয়স্ক ভাতা থেকে শুরু সরকারের নানা সেবামূলক কর্মকা-ে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হচ্ছেন কিছু কিছু দায়িত্বশীল নেতা। এতে করে ঐতিহ্যবাহী দলটির এত অর্জনের পরেও আজ নানা প্রশ্নের সম্মুখীন। অন্যদিকে বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ সংক্রমণে নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে দলটি। এই ভাইরাস মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগ বাস্তবায়নেও কোথাও কোথাও অবহেলা লক্ষ্য করা গেছে। দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়েও রয়েছে দায়িত্বে অবহেলার চিত্র। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশ থাকা সত্ত্বে¡ও অনেক জনপ্রতিনিধিকে জনসম্পৃক্ত হতে দেখা যায়নি। জনগণের পাশে থাকতে দেখা যায়নি অনেক কেন্দ্রীয় নেতাকেও। দলের নেতাকর্মীদের এমন উদাসীনতাও মানুষের কাছে দলকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। তবে অতীতের মতোই সব বাধা উজিয়ে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্যা কন্যার নেতৃত্বে পথ চলবে আওয়ামী লীগ, অতীতের মতোই আলোর ঝা-া হাতে পথ দেখাবে দেশ ও জাতিকে- দলের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ও সমর্থকদের এমনটাই বিশ্বাস।
৭২ বছরে পদার্পণ প্রসঙ্গে কথা হয় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কর্নেল (অব) ফারুক খানের সঙ্গে। আমাদের সময়কে তিনি বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ দল আওয়ামী লীগ। এটা গর্বের সঙ্গে বলা যায়, বাংলাদেশের যত উন্নয়ন ও অর্জন সব আওয়ামী লীগের হাত ধরে। এর নেপথ্যে দুটি মানুষের অবদান সর্বাগ্রে-প্রথমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান; পরে তার কন্যা শেখ হাসিনা। এ ছাড়াও দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা দেশের উন্নয়নে নানাভাবে ভূমিকা রেখেছেন। কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক তথা সার্বিক উন্নয়নের জন্য শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল। তবে এ কথাও সত্য যে, কিছু কিছু নেতার জন্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সুনাম ক্ষুণœ হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সভাপতি এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিচ্ছেন। অপরাধীকে দলীয় বিবেচনার বাইরে রেখে তিনি বিচারের আওতায় এনেছেন এর নানা নজির আছে বলেও জানান আওয়ামী লীগের এই নেতা। কোভিড-১৯ মোকাবিলায়ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার পৃথিবীর অন্য দেশের তুলনায় ভালো করছে বলে জানান ফারুক খান।
তিনি বলেন, ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখব দলটি প্রতিষ্ঠার পর মুসলিম লীগের নেতাকর্মীদের একটি অংশ বেরিয়ে গিয়ে রাজনৈতিক কর্মিসম্মেলনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে নতুন দল গঠন করেন। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ দলটি প্রতিষ্ঠার প্রায় চার বছর পর ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে অসা¤প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ নামে বাঙালির অধিকার আদায়ের লড়াই সংগ্রামের ব্রত নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালির অধিকার আদায়ের প্লাটফরম হয়ে ওঠে আওয়ামী লীগ। প্রথম সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক হন শামসুল হক। বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রথম কমিটির যুগ্ম সম্পাদক। ধারাবাহিকতার এক পর্যায়ে শেখ মুজিবুর রহমানই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আসেন। ১৯৬৬ সালের সম্মেলনের মধ্য দিয়ে তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব পান। আওয়ামী লীগের মাধ্যমে অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত হন। হয়ে ওঠেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক শেখ মুজিব।
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগ বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পাকিস্তানের শাসন-নির্যাতন, সা¤প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আন্দোলন, ৫২-তে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, ৫৪র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়, ৬৬র ৬ দফা আন্দোলন, ৬৯র গণঅভ্যুত্থান, শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে অধিকার আদায়ের সকল আন্দোলন এক পর্যায়ে স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নেয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা অর্জিত হয়। বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে।
৭১র মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সরকার দেশ গঠনে মনোনিবেশ করে। কিন্তু স্বাধীনতার পর ৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলে পরবর্তী দীর্ঘ সময় দেশে একের পর সামরিক স্বৈরশাসনের যে অভিশাপ নেমে আসে, তার বিরুদ্ধে সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্ব দেয় ঐতিহ্যবাহী এই দল।
এই সুদীর্ঘ পথপরিক্রমায় আওয়ামী লীগকে অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। অনেক চড়াই-উতরাই এবং ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে এগোতে হয়েছে। কখনো নেতৃত্বের শূন্যতা, কখনো দমন-পীড়ন, কখনো ভাঙনের মুখে পড়তে হয়েছে দলটিকে। বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা এবং ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর নেতৃত্ব শূন্যতায় পড়ে আওয়ামী লীগ। এই শূন্যতা থেকেই দলের মধ্যে একাধিক ভাঙন এবং গ্রুপিং দেখা দেয়।
দলের চরম ক্রান্তিকালে ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের হাল ধরেন। দ্বিধা-বিভক্ত আওয়ামী লীগ আবার ঐক্যবদ্ধ হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে। প্রায় চার দশক ধরে তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পরিচালিত হচ্ছে। এই সময়ে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন-সংগ্রামের পাশাপাশি চারবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পেরেছে আওয়ামী লীগ। তবে ৭০ বছরের মধ্যে প্রায় ৫০ বছরই আওয়ামী লীগকে থাকতে হয়েছে রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে, আন্দোলন-সংগ্রামে। ’৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে বিজয়ের পর ’৫৬ সালে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা গঠন করলেও তা বেশি দিন টেকেনি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু প্রায় সাড়ে তিন বছর সরকার চালান। এর পর ১৯৯৬ সালে তার কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ৫ বছর রাষ্ট্র চালায় আওয়ামী লীগ। মাঝে সাত বছর বাদ দিয়ে বর্তমানে টানা ৩ বার রাষ্ট্রক্ষমতায় আছে স্বাধীনতার নেতৃত্বদাতা দলটি।
এবারের আয়োজন
এবারের জন্মবার্ষিকীর আয়োজনটি অন্য বছরের তুলনায় আরও বেশি বর্ণাঢ্য পরিসরে হওয়ার কথা ছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর অংশ হিসেবে দলটির এবারের জন্মদিন পালনে ছিল নানা পরিকল্পনা। কিন্তু করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশকেও থমকে দিয়েছে। তাই স্বপ্নের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী চলে যাবে নীরবেই। থাকবে সীমিত আয়োজন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এবার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন সকাল ৬টায় ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যলয়ের সামনে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তলন করা হবে। স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করে সকাল ৯টায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন দলটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির কয়েকজন সিনিয়র সদস্য। বিকেলে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে উপস্থিত নেতাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আলোচনাসভায় অংশগ্রহণ করার কথা রয়েছে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। তবে ভিডিও কনফারেন্সে শেখ হাসিনার অংশগ্রহণের বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এদিন টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন আওয়ামী লীগের ৪ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন ও কেন্দ্রীয় সদস্য শাহাবুদ্দিন ফরাজি।
এছাড়া প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ ওয়েবিনার ‘তারুণ্যের প্রত্যাশায় আওয়ামী লীগ’ গতকাল রাত ৮টা ৩০ মিনিটে প্রচারিত হয়। আজ ‘গণমানুষের দল আওয়ামী লীগ’ শিরোনামে রাত সাড়ে ৮টায় ওয়েবিনার আওয়ামী লীগের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ এবং ইউটিউব চ্যানেলে প্রচার হবে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি জেলা, মহানগর, উপজেলা এবং ইউনিটে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তলন করতে নির্দেশনাা দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক দূরত্ব মেনে সারা দেশে সীমতি পরিসরে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করবেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
সূত্র- দৈনিক আমাদের সময়
…বাসাইলসংবাদ/ ২৩ জুন, ২০২০ /একেবি
সকলের অবগতির জন্য নিউজটি শেয়ার করুন




