
নিউজ ডেস্ক : বিভীষিকাময় ২১ আগস্ট আজ। এ দিন রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে নজিরবিহীন গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এতে নিহত হন ২৪ জন। হামলায় আক্রান্ত হন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, এ হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আদালত যে রায় দিয়েছেন, তা অবিলম্বে বাস্তবায়ন করতে হবে; উন্মোচন করতে হবে ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ।

আজ ইতিহাসের জঘন্যতম ওই গ্রেনেড হামলার ১৯তম বার্ষিকীতে বাঙালি জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে হামলায় নিহত ব্যক্তিদের। এ উপলক্ষে নানা কর্মসূচি পালন করবে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। এর মধ্যে আজ বেলা সাড়ে ১১টায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে নির্মিত শহীদ বেদিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করা হবে। এ ছাড়া গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদ ও নিহতদের স্মরণে আলোচনাসভা হবে। এতে বক্তব্য রাখবেন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এদিকে ২১ আগস্ট উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৪ সালের এই দিনে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় ঢাকায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী সমাবেশে বর্বরতম গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এ হামলার মূল লক্ষ্য ছিল দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করা এবং আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশকে নেতৃত্বশূন্য করে হত্যা, ষড়যন্ত্র, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি ও দুঃশাসনকে চিরস্থায়ী করা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মহান আল্লাহর অশেষ রহমত ও জনগণের দোয়ায় আমি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যাই। আওয়ামী লীগের নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীরা মানববর্ম তৈরি করে আমাকে রক্ষা করেন। আমি ২১ আগস্টের সকল শহীদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি এবং আহতদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।’
শেখ হাসিনা বলেন, প্রকাশ্য দিবালোকে রাজনৈতিক সমাবেশে এ ধরনের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এ নারকীয় হামলা ও হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে বিচার করা ছিল সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে উল্টো হত্যাকারীদের রক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। হামলাকারীদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। গুরুত্বপূর্ণ সব আলামত ধ্বংস করে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী এখনও নানাভাবে ষড়যন্ত্র করছে। আসুন, ঐক্যবদ্ধভাবে এই অপশক্তির যে কোনো চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে আগামী প্রজন্মের জন্য বাংলাদেশকে একটি নিরাপদ-শান্তিপূর্ণ আবাসভূমি হিসেবে গড়ে তুলি।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করার জন্য আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনকে আহ্বান জানিয়েছেন।
বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কে অস্থায়ী মঞ্চে (ট্রাকে) আয়োজিত সমাবেশে একের পর এক গ্রেনেড হামলা চলাকালে দলের নেতাকর্মীরা মানবঢাল তৈরি করে শেখ হাসিনাকে রক্ষা করেন; কিন্তু গ্রেনেডের আঘাতে আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ নেতাকর্মী প্রাণ হারান। পরবর্তী সময়ে আদালতের রায়ে উঠে আসে, তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের প্রত্যক্ষ মদদেই হামলাটি চালানো হয়।
২১ আগস্টের হামলায় আহত হন আওয়ামী লীগের বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। তিনি আমাদের সময়কে বলেন, যারা একুশে আগস্টের মতো ভীতিকর ঘটনা ঘটিয়ে সাজাপ্রাপ্ত, তাদের রায় অচিরেই কার্যকর হোক। যারা এই বর্বরোচিত ষড়যন্ত্রে যুক্ত তাদের মুখোশ উন্মোচন করারও দাবি জানাই। যারা ঘটনা ঘটিয়েছে, তারা বাঙালির শত্রু, বাংলাদেশের শত্রু। তারা আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার পাশাপাশি দেশের হাজার বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে চেয়েছিল। এদের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে।
ওই সময় ক্ষমতায় ছিল বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার। সেদিন ‘সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতিবিরোধী’ শান্তি সমাবেশের আয়োজন করেছিল তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা। বক্তব্য শেষ হতে না হতেই তাকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি গ্রেনেড হামলা শুরু হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুহুর্মুহু গ্রেনেড বিস্ফোরণে মুহূর্তেই মুত্যুপুরীতে রূপ নেয় সমাবেশস্থল। স্পিøন্টারের আঘাতে মানুষের হাত-পাসহ বিভিন্ন অঙ্গ ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। রাজধানীর প্রতিটি হাসপাতালে ছিল আহতদের আর্তনাদ।
গ্রেনেড হামলায় আহত হন আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘তারেক রহমানই হাওয়া ভবনে বসে গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা করে।’ তিনি বলেন, ‘সেই তারেক রহমান আজ পালিয়ে লন্ডন গিয়ে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন। তাকে দেশে এনে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হোক।’ একই দাবি জানান গ্রেনেড হামলায় আহত ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সদস্য আবুল কাসেমও।
ভাগ্যগুণে নারকীয় গ্রেনেড হামলায় প্রাণে বেঁচে যান শেখ হাসিনা। ঘাতকদের প্রধান লক্ষ্য ছিল শেখ হাসিনা। তিনি বেঁচে গেছেন দেখে গ্রেনেড হামলার পর তার গাড়ি লক্ষ্য করে ১২ রাউন্ড গুলিও ছোড়া হয়। তবে গাড়ি বুলেটপ্রুফ হওয়ায় তিনি রক্ষা পান। হামলার পরই শেখ হাসিনাকে নিয়ে যাওয়া হয় তার তৎকালীন বাসভবন ধানমন্ডির সুধা সদনে।
গ্রেনেড হামলায় আহত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সদস্য সাহাবুদ্দিন ফরাজী বলেন, ‘৭১ এর পরাজিত শক্তি জাতিকে নেতৃত্বশূন্য করতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। বিদেশে থাকায় বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা। সেই পরাজিত শক্তি আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব শূন্য করতে, জাতীয় সংগীত ও পতাকা জাতির নিকট থেকে কেড়ে নিতে ২১ আগস্ট ভীতিকর গ্রেনেড হামলা চালায়।’
২১ আগস্ট ঘটনাস্থলেই নিহত হন ১৬ জন। পরে সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৪ জনে। রক্তাক্ত-বীভৎস ওই ভয়াল গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমান ছাড়াও সেদিন নিহত হন ল্যান্স করপোরাল (অব) মাহবুবুর রশীদ, হাসিনা মমতাজ রিনা, রিজিয়া বেগম, রফিকুল ইসলাম (আদা চাচা), রতন শিকদার, মোহাম্মদ হানিফ ওরফে মুক্তিযোদ্ধা হানিফ, মোশতাক আহমেদ, লিটন মুনশি, আবদুল কুদ্দুছ পাটোয়ারী, বিল্লাল হোসেন, আব্বাছ উদ্দিন শিকদার, আতিক সরকার, মামুন মৃধা, নাসির উদ্দিন, আবুল কাসেম, আবুল কালাম আজাদ, আবদুর রহিম, আমিনুল ইসলাম, জাহেদ আলী, মোতালেব ও সুফিয়া বেগম।
হামলায় আওয়ামী লীগের চার শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। এদের অনেকেই শরীরে স্পিন্টার নিয়ে আজও মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আহত হন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কর্মীরাও।
এদিকে গ্রেনেড হামলার পর ভয়, শঙ্কা ও ত্রাস গ্রাস করে গোটা রাজধানীকে। হামলার পর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নিজে বাঁচতে ও অন্যদের বাঁচাতে যখন ব্যস্ত হয়ে পড়েন, ঠিক তখনই পুলিশ তাদের লাঠিচার্জ করে; ব্যবহার করে টিয়ারশেল। ঘটনার পরই নষ্ট করা হয় যাবতীয় আলামত। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রত্যক্ষ মদদে ওই ঘটনা ধামাচাপা দিতে ‘জজ মিয়া’ নাটক সাজানোর অভিযোগ ওঠে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিরুদ্ধে।
সূত্র- দৈনিক আমাদের সময়
বাসাইলসংবাদ, ২১ আগস্ট, ২০২৩ / একেবি
সকলের অবগতির জন্য নিউজটি শেয়ার করুন




