
বাসাইলসংবাদ: শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৮:

বাসাইলসংবাদ ডেস্ক :
দেশের ইতিহাসে ১৯৭৩ সালের পর এই প্রথম সংবিধানের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা কোন রাজনৈতিক দলের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দীর্ঘ ৪৫ বছর পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষণ নেতৃত্বেই এ অধরা অধ্যায়কে ছুঁতে পেরেছে বাংলাদেশ। মুক্তি পেয়েছে অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক নামক পুতুল সরকারের অভিশাপ থেকে।
১৯৭৩ সালের নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল এবং সব দলের অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে সেইবার নির্বাচন হয়েছিল। এরপর ১৯৭৫ সালে ক্ষমতার লোভে সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তি সুপরিকল্পিতভাবে দেশের অবস্থানকে ক্রমাগত পাকিস্তানি আমলের মতো প্রতিক্রিয়ামুখী করার চেষ্ঠা চালায়।
১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন হয় তৎকালীন সেনাশাসক ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের অধীনে। একই সাথে ১৯৮৬ সালে তৃতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সেসময়ের সেনাশাসক ও জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের অধীনে। এই দুই নির্বাচনের আগেই কমবেশি আন্দোলন হয়েছিল অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। যেখানে এরশাদের আমলের নির্বাচন বিএনপি বয়কটও করেছিল!
পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে স্বৈরশাসক এরশাদের অধীনেই পুনরায় চতুর্থ সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করা হলে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার দাবিতে ও এরশাদের প্রতি অনাস্থার ফলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮ দল, বিএনপির নেতৃত্বে ৭ দল ও বামপন্থীদের ৫ দলের আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে নির্বাচন বয়কট করে। আর সেই সফল অন্দোলনের পটভূমিতে এরশাদ ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়।
সব দলের আন্দোলনের মুখে ৯০ এ এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। উক্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি আসনের বিপরীতে ৪২৪ জন স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ ৭৫টি দল থেকে মোট ২৭৮৭ জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেয়। নির্বাচনে খালেদা জিয়া নেতৃত্বাধীন বিএনপি জয় লাভ করে। তারা ৩০০টি আসনের মধ্যে ১৪০টি আসন লাভ করে। মোট ভোট গৃহীত হয়েছিল ৫৫.৪%।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপির অধীনে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল নির্বাচনটি বর্জন করেছিল। ভোটারবিহীন সেই নির্বাচনে মোট ভোট গৃহীত হয়েছিল মাত্র ২১%। প্রহসনের সে নির্বাচনে বিএনপি ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৭৮টি আসনে জয় লাভ করে। সেসময়কার সরকারের সংসদ অধিবেশন স্থায়ী ছিল চার কার্যদিবস। এরপর বিরোধী দলের আন্দোলনের পটভূমিতে ৩০শে মার্চ ১৯৯৬ সালে সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
১৯৯৬ সালের ১২ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দেশের দুই প্রধান দলের অংশগ্রহণে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৩০০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে।
এরপর ২০০১ সালের ১ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যেটা ১৯৯৬ সালে চালু হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে দ্বিতীয় নির্বাচন। নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ছিলেন লতিফুর রহমান।
এরপর ২০০৮ সালে আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। যেখানে বিএনপির চরম ভরাডুবি হয়।
সময় মতো নির্বাচন না দিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখায় নবম সংসদ নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ওপর আস্থা হারায় রাজনৈতিক দলগুলো। ফলে ২০১৪ সালের দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর এ নির্বাচনে তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি- আন্দোলন ও অগ্নি সন্ত্রাস পরিচলনার মাধ্যমে একযোগে দেশব্যাপী অরাজকতা সৃষ্টি করতে থাকে এবং নির্বাচন বয়কট করে।
যদিও ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ সরকার প্রধান শেখ হাসিনা অনেক চেষ্টা করেছিলেন সব দলকে নির্বাচনে আনতে। কিন্তু সম্ভব হয়নি। বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে খালেদার সাথে সংলাপে বসারও উদ্যোগ নিয়েছিলেন, টেলিফোনে কথা বলেছিলেন খালেদার সাথে। কিন্তু খালেদার অনাগ্রহের কারণে শেখ হাসিনার উদ্যোগ সফল হয়নি। শুধু তাই নয়, খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মারা গেলে একজন মমতাময়ী মা হিসেবে এক সন্তানহারা মাকে সান্তনা দিতে খালেদার বাসায় ছুটে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। কিন্তু তাকে বাসার ভেতর ঢুকতে দেওয়া হয়নি।
পরবর্তীতে, ২০১৪ সালের নির্বাচন অসাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অজুহাতে নির্বাচন বয়কট করে বিএনপি। তারা শুধু নির্বাচন বয়কট করে ক্ষান্ত হয়নি, নির্বাচন প্রতিহতের নামে সারা দেশে নাশকতার নামে মানুষের রক্ত নিয়ে হোলি খেলায় মেতে ওঠে । যদিও পরবর্তীতে বিএনপি তাদের এই ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দিয়েছে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে।
৫ বছর ঘুরে আবারো নির্বাচনের মৌসুম শুরু হয়েছে। শেখ হাসিনা তাঁর দক্ষ নেতৃত্বের বদৌলতে সকল রাজনৈতিক দলের আস্থা অর্জন করতে পেরেছেন। বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন কমিশন স্থানীয় নির্বাচনগুলো নিরপেক্ষভাবে আয়োজন করায় বর্তমান নির্বাচন কমিশনের প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা বেড়েছে বলে মনে করেন একধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক। নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে বিএনপির অভিযোগের বিষয়ে একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক জানান- এগুলো বিএনপির নির্বাচনী কৌশলের একটি অংশ। দেশে নির্বাচনের পরিবেশ না থাকলে বিএনপি এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করত না।
এরই মধ্যে মনোনয়নপর্ব শেষ। শুরু হয়েছে প্রচারপর্ব। ৩০ ডিসেম্বর ভোটপর্বে অংশ নেয়ার জন্য দেশবাসী উন্মুখ হয়ে আছে। এ নির্বাচনের আগে কোনো আন্দোলন নেই, শান্তিপূর্ণভাবে সংলাপ হয়েছে, স্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আর সরকার দলের অধীনে ১৯৭৩ সালের পর সব দলের অংশগ্রহণে আর এমন নির্বাচন আর হয়নি। আর এ ক্ষেত্রে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচক্ষণ চিন্তাধরা ও রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তার বিষয়টি দেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও অগ্রযাত্রার ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ এবং একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
সূত্র- বাংলার আমরা
বাসাইলসংবাদ/একে




