
বাসাইলসংবাদ: শনিবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০১৮:

বাসাইলসংবাদ ডেস্ক :
আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র আর কয়েকদিন বাকি। এরই মধ্যে দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করছে। গত ১৭ ডিসেম্বর সোমবার নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে ড. কামাল হোসেনের ঐক্যফ্রন্ট। একদিন পরেই আবার আলাদা করে ইশতেহার ঘোষণা করে ঐক্যফ্রন্টের সবচেয়ে বড় শরিক বিএনপি। আলাদা আলাদা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার মাধ্যমে ধুম্রজাল সৃষ্টির মাধ্যমে শুরু হলো কথিত ঐক্যফ্রন্টের ৩০ ডিসেম্বরের চূড়ান্ত নির্বাচনী যাত্রা।
বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারের সামঞ্জস্য ও অসামঞ্জস্যতাঃ
গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার যে লক্ষ্য নিয়ে নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে দলটি সেখানে নির্বাচনের দিনের গণতন্ত্রকে নিত্যদিনের অনুশীলনে পরিণত করার কথা বলা হয়েছে। সামরিক শাসনের মাধ্যমে বন্দুকের নল ঠেকিয়ে ক্ষমতা হরণ করা জিয়াউর রহমানের শাসনামাল থেকেই যে একনায়কতন্ত্রের সূচনা হয়েছিল তা বিএনপি বার বার চর্চা করে এসেছে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বিএনপি-জামায়াত জোটের অপশাসনকে রুখে দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে যে গণতন্ত্রের ধারা রচিত হয়েছে তার চর্চা আছে বলেই দলীয় সরকারের অধীনে থেকেও একটি পূর্ণ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন উপহার দিতে পেরেছে আওয়ামী লীগ সরকার। ক্ষমতার ভারসাম্যের যে কথা বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে বলা হয়েছে, তা বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের ক্ষমতার ভাগ বাটোয়ারা ছাড়া আর কিছুই নয়। একাধারে দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকার যে বিধানের কথা বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে তা দলের নেতৃত্বের প্রতি অযোগ্যতাকেই নির্দেশ করে । যোগ্য নেতৃত্বের প্রতি জনগণের যে আকাঙ্খা তা শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থনের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া যায়। শর্তসাপেক্ষে সাংসদদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা, জাতীয় সংসদে উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠা, সংসদে উল্লেখযোগ্য নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠা, একদলীয় শাসনের পুনরাবৃত্তি না ঘটনো, প্রশাসনিক স্বচ্ছতাসহ যে সকল দিক বিএনপির ইশতেহারে উল্লেখিত হয়েছে তা শুধুই বিএনপির রাজনৈতিক প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়। জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনামাল থেকে শুরু করে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে সাংসদ ও জনগণের মত প্রকাশের যে অধিকার লুণ্ঠিত হয়েছিল তা শেখ হাসিনার হাত ধরে ফিরে আসে। মহান জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগে আমলেই সংরক্ষিত নারী আসনে নারীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাসহ বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নারী স্পিকার দিয়ে সংসদ পরিচালনা করার মাধ্যমে সারাদেশে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার নামে বিএনপির ইশতেহারে যে সকল পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে তার সবগুলোই অনেক আগে বাস্তবায়িত হয়ে গেছে। জাতীয় সংসদে উচ্চ কক্ষ প্রতিষ্ঠার মতো যেসব সংবিধানবিরোধী পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে তা গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের পরিপন্থি। বিডিআর হত্যাকাণ্ড ও বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির তথ্য প্রকাশের যে কথা বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। কারণ ইতোমধ্যেই বিডিআর হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার প্রক্রিয়া সমাপ্ত করে দায়ী ব্যাক্তিদের বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি নিশ্চিত করা হয়েছে। রিজার্ভ চুরির ঘটনায় চুরি হওয়া বেশিরভাগ অর্থই দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে এবং বাকি অর্থ ফেরত আনা প্রক্রিয়াধীন আছে। প্রশাসন ও বিভিন্ন বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর নামে যে কথা বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে তা সম্পূর্ণ কাল্পনিক। আওয়ামী লীগ শাসনামালে শেখ হাসিনার হাত ধরে সামরিক ও আধা-সামরিক সকল বাহিনীকে সবচেয়ে আধুনিকভাবে গড়ে তোলা হয়েছে। একদলীয় শাসন ও প্রতিহিংসার রাজনীতি বিলুপ্ত করতে শেখ হাসিনা সরকার সকল দলের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করে অংশগ্রহণমূলক স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছে যা বিএনপির ইশতেহার ঘোষিত গণতন্ত্র ও আইনের শাসন চিত্র অনেক আগেই বাস্তবায়িত হয়ে আছে।
বিএনপির ইশতেহারে বিচার বিভাগ নিয়ে যে পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অগ্রহণযোগ্য। রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সুপ্রিম কোর্টের হাতে নিম্ন আদলতের নিয়ন্ত্রণ ন্যাস্ত করা সংবিধানসম্মত নয় এবং তার প্রয়োজন নেই । বিচার বিভাগ এখন সম্পূর্ণভাবে স্বাধীন। মামলার জট কমানোর জন্য আওয়ামী লীগ শাসনামালে সবচেয়ে বেশি বিচারক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর আাগে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ইশতেহারে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।
মত প্রকাশের স্বাধীনতার যে প্রতিশ্রুতি বিএনপির ইশতেহারে দেয়া হয়েছে তা জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানো ছাড়া আর কিছুই নয়। ২০০১ সালে বিএনপির ইশতেহারে রেডিও টেলিভিশনের স্বায়ত্বশাসনের কথা বলা হলেও তা করা হয়নি। আওয়ামী লীগ শাসনামালে বাংলাদেশে রেডিও টেলিভিশনের স্বায়ত্বশাসিত হয় এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বেসরকারী রেডিও টেলিভিশনের অনুমোদন দেয়াসহ গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে মত প্রকাশের স্বাধীনতা প্রদান করা হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের শাসনামালে নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের হাতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সফলভাবে হয়ে আসছে।
বিএনপির ইশতেহারে জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার ১১ শতাংশে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। অথচ ২০০৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় যেখানে ছিল ৫৪৩ মার্কিন ডলার সেখানে বর্তমানে এক হাজার ৭৫১ মার্কিন ডলারে উন্নিত হয়েছে। বৈদেশিক রিজার্ভ তিন বিলিয়ন ডলার থেকে ৩৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয় শেখ হাসিনার হাত ধরে। ২০০৬ সালে দারিদ্রের হার যেখানে ৪১ দশমিক পাঁচ শতাংশ ছিল, সেখানে বর্তমানে দারিদ্রের হার ২১ দশমিক আট শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি দেশের একটি দেশ আজ বাংলাদেশ। বিগত ১০ বছরে বাংলাদেশের জিডিপি’র আকার প্রায় পাঁচ গুনের বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ৪ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা থেকে প্রায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনীতিতে বিশ্বের ১১ তম হয়েছে। সুতরাং বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার ১১ শতাংশে উন্নীত করার কথা জনগনের সাথে প্রতারণার সামিল।
মুক্তিযোদ্ধাদের ‘রাষ্ট্রের সম্মানিত নাগরিক’ হিসেবে ঘোষণা করা এবং মুক্তিযোদ্ধা তালিকা প্রণয়নের নামে দুর্নীতির অবসান ঘটানোসহ মূল্যস্ফীতির নিরিখে শহীদদের পরিবারের ভাতা বৃদ্ধি করার কথা বলে মুক্তিযোদ্ধদের প্রতি মিথ্যাচার ও ছলনার আশ্রয় নেয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতকে সাথে নিয়ে জোট বাঁধা আর বিএনপির ঐক্যফ্রন্ট মুক্তিযোদ্ধাদের দায়িত্ব নিয়ে কাজ করবে এটি ভিত্তিহীন এবং অবাস্তব। মুক্তিযোদ্ধা এবং তার সন্তানেরা একমাত্র আওয়ামী লীগ সরকারকে নিজেদের অভিভাবক হিসেবে গণ্য করে।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে শিক্ষাখাতে জিডিপির পাঁচ শতাংশ ব্যয় করার কথা বলা হয়েছে বিএনপির ইশতেহারে। উচ্চ শিক্ষা, শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষা ঋনসহ নানা সুবিধার কথা বলা হলেও এই ইশতেহারে বিএনপির মিথ্যাচার প্রতিফলিত হয়েছে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থান খাতে ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি যে ইশতেহার ঘোষণা করেছিল তার ২০ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম হয়নি। বরং গত ১০ বছরে বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে ব্যাপক সাফল্য সারাবিশ্বে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছে। সারাদেশে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সকল শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে বই বিতরণ কর্মসূচি ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে সাফল্যের অনন্য নজির।
বিগত ১০ বছরে ৩০ হাজারের অধিক ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা, দুই হাজার গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, ৫০০ এর অধিক কলেজ সরকারিকরণ, ৫০ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাস রুম স্থাপন করাসহ ব্যাপক সাফল্যের নজির স্থাপিত হয়েছে।
এছাড়াও তথ্য ও প্রযুক্তি, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি, বৈদেশিক ও প্রবাসী কল্যাণ, কৃষি ও শিল্প, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, প্রতিরক্ষা ও পুলিশ নিয়ে যতো প্রতিশ্রুতির কথা বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে তার সবগুলোই অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারেও উল্লেখ ছিল যার ২০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়নি।
সূত্র- বাংলার আমরা
বাসাইলসংবাদ/একে




