
নিজস্ব প্রতিবেদক : টাঙ্গাইলের বাসাইলে উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রি-বার্ষিক সম্মেলনকে ঘিরে নেতাকর্মীদের মাঝে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে সরগরম। আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের মাঝে দীর্ঘদিনের কোন্দলকে কেন্দ্র করে শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা যার যার সমর্থিত পদপ্রত্যাশীদের ক্ষমতায় নিতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। এ সম্মেলনের সমাবেশ রবিবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) উপজেলা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পাদদেশে অবস্থিত কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত হবে। সমাবেশ স্থলের মঞ্চ ও প্যান্ডেল তৈরিসহ সকল প্রকার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে উপজেলা আওয়ামী লীগ।

সম্মেলনকে ঘিরে নবীন-প্রবীণ পদপ্রত্যাশীদের বাহারী রং ও ডিজাইনের পোস্টার, ব্যানার, ড্রপডাউন ও বিলবোর্ডে ছেয়ে গেছে রাস্তা-ঘাট ও অলিগলিসহ পুরো শহর। রাস্তায় রাস্তায় নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন শুভেচ্ছা তোরণ। সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দলের জেলা ও উপজেলাসহ তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। সব মিলিয়ে সরগরম হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অঙ্গন। তবে উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং দ্বন্দ্ব ও কোন্দলের রেশ এখনও কাটেনি।
একাধিক নেতাকর্মীরা জানান, গত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের মাঝে কোন্দলের সৃষ্টি হয়। এই কোন্দল বাসাইল ও সখীপুরে বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যে রূপ নেয়। এরপর থেকেই বাসাইল ও সখীপুর উপজেলায় আওয়ামী লীগের মাঝে দুইটি গ্রুপের সৃষ্টি হয়। সেই গ্রুপিং এখনও চলমান রয়েছে। গত বাসাইল উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দুইভাগে বিভক্ত হয়। আওয়ামী লীগ মনোনিত প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করে নিজেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে অংশ নেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী অলিদ ইসলাম। এঘটনায় তাকে পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময় দফায় দফায় এই গ্রুপিং প্রকাশ্যে আসে। এই সম্মেলনকে কেন্দ্র করেও কোন্দল প্রকাশ্য আসতে পারে বলেও একাধিক নেতাকর্মীরা আশংকা করছেন।

এদিকে, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে একাধিক হেভিওয়েট প্রত্যাশী থাকায় তৃণমূলের সকল নেতাকর্মীদের মাঝে বইছে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড়। দলের প্রভাবশালী নেতাদের ড্রয়িং রুম থেকে শুরু করে চায়ের দোকান পর্যন্ত চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। চলছে চুলছেরা বিশ্লেষণ ও হিসাব-নিকাশ। এরই মধ্যে সরগরম হয়ে উঠেছে তৃণমূল আওয়ামী লীগের রাজনীতি। আওয়ামী লীগের দু’গ্রুপের মাঝে দীর্ঘদিনের কোন্দলকে কেন্দ্র করে শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতারাও যার যার সমর্থিত পদ প্রত্যাশীদের ক্ষমতায় নিতে জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে তৃণমূল নেতাকর্মীদের দাবি। তৃণমূল নেতাকর্মীরা ত্যাগী ও ক্লিন ইমেজের দুই শীর্ষ নেতাকে দায়িত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে প্রতি ইউনিয়নে ৩১ জন করে মোট ২১৭জন, উপজেলা কমিটির ৭১ জন এবং ১৫ জন কো-অপট সদস্যসহ মোট ৩০৩ জন কাউন্সিলরের তালিকা রয়েছে। যারা প্রয়োজনে ভোট প্রয়োগ করে নেতা নির্বাচন করবেন।
সম্মেলনে সভাপতি পদে প্রার্থী হিসেবে নাম শোনা যাচ্ছে পাঁচজনের। এরা হলেন- উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ত্যাগী নেতা হাজী মতিয়ার রহমান গাউজ, বাসাইল পৌরসভার মেয়র আব্দুর রহিম আহমেদ, উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা সদস্য অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম আলো, টাঙ্গাইল জেলা কৃষকলীগের সভাপতি জহিরুল ইসলাম মাষ্টার ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি একে আজাদ খানশুর।

সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে ১২জনের নাম। এরা হলেন- উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আব্দুস সাত্তার জমাদার, উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা সদস্য আলহাজ আব্দুল মোমেন জমাদার, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক শফিউল আরেফিন খানশুর সুজন, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও বাসাইল ডিগ্রী কলেজের সাবেক জিএস আল মামুন খান নবু, উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আলহাজ শাহাদত হোসেন খান, কাশিল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মির্জা রাজিক, বাসাইল ডিগ্রী কলেজের সাবেক ভিপি জাদিদুর রহমান রোনু, কাউলজানী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যন হাবিবুর রহমান চৌধুরী হবি, উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আবু হানিফ মিয়া, আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তফা খান রাজিব, উপজেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক সোহানুর রহমান সোহেল ও সাবেক ছাত্র নেতা শফিকুল ইসলাম।
উপজেলা আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক ভজন কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীরা সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনের দায়িত্ব পালন করবেন। তারা ত্যাগী ও ক্লিন ইমেজের নেতা বাছাই করে সভাপতি-সম্পাদক নির্বাচিত করবেন। আমি চাই তৃণমূলের কাউন্সিলরদের সমর্থন ও ভোটের মাধ্যমে সভাপতি-সম্পাদক নেতৃত্বে আনা হোক।’
কোন্দল ও উত্তেজনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের মাঝে তো কোন্দল আছেই। তবে এখনও সম্মেলনকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে কোনও ধরণের ঝামেলার সৃষ্টি হয়নি। এটা তো পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে।’
উপজেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক হাজী মতিয়ার রহমান গাউজ বলেন, ‘দুঃসময়ে দলের জন্য কাজ করেছি। ভবিষ্যতেও তৃণমূলের সংগঠনকে শক্তিশালী করে দেশ ও দলের জন্য আমরণ কাজ করে যাবো। আমাদের দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তই আমাদের কাছে চূড়ান্ত। তিনি আমাকে দায়িত্ব দিলে অবশ্যই আমি পালন করবো ইনশাআল্লাহ।’
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী অলিদ ইসলাম বলেন, ‘আমি সম্মেলনে অংশ নিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছি। তিনি অনুমতি দিলে আমি সভাপতি পদে প্রার্থী হবো।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি চাই শিক্ষিত ও ত্যাগী নেতা নেতৃত্বে আসুক এবং কাউন্সিলরদের সমর্থনে নেতা বাছাই করা হোক।’
সম্মেলনের বিষয়ে জানতে টাঙ্গাইল-৮ (বাসাইল-সখীপুর) আসনের সংসদ্য সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জোয়াহেরুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি সাড়া দেননি।
প্রসঙ্গত, সর্বশেষ ২০১৫ সালের ১৯ এপ্রিল বাসাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সময় সভাপতির পদ পান কাজী অলিদ ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদকের পদ পান হাজী মতিয়ার রহমান গাউজ। গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় কাজী অলিদ ইসলামকে সভাপতির পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পান উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শামছুল আলম মাষ্টার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, জেলা পরিষদের প্রশাসক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান খান ফারুক। সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক এমপি, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম এমপি, শিক্ষা ও মানব সম্পদ সম্পাদক শামসুন নাহার চাঁপা ও মহিলাবিষয়ক সম্পাদক মেহের আফরোজ চুমকি এমপি। সম্মেলনের প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখবেন টাঙ্গাইল-৮ (বাসাইল-সখীপুর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জোয়াহেরুল ইসলাম। এছাড়াও বক্তব্য রাখবেন জাতীয় শ্রমিক লীগের সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম খান।
বাসাইলসংবাদ/ ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ / একেবি
সকলের অবগতির জন্য নিউজটি শেয়ার করুন




