
বাসাইলসংবাদ: শুক্রবার , ২২ মার্চ, ২০১৯:

॥ রেজাউল করিম ॥
দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নব নির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নূর। এমন অরাজনৈতিক ছাত্র ঢাকা বিদ্যালয়ের ভিপি হবেন, নের্তৃত্ব দিবেন পুরো ছাত্রগোষ্ঠিকে এটা অনেকেই ভাবেননি। আবার কেউ কেউ নূরকে নিয়ে আরও বড় কিছু ভেবেছেন। তবে যে যেভাবেই ভাবুক ২৮ বছরের মাথায় নির্বাচিত নতুন এই ভিপিকে নিয়ে ভাবনাটা ছোট রাখার কোন সুযোগ নেই। নূরের কাছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের চাওয়ার তালিকাটাও লম্ভা। চাহিদা পূরণে নূরের চেষ্টা থাকবে সর্বোচ্চ এমন প্রত্যাশাও স্বাভাবিক।
নূর পারিবারিক শিক্ষা পেয়েছে “জীবন সংগ্রাম”। বাবা ইদ্রিস হাওলাদার কৃষিকাজের পাশাপাশি চায়ের দোকানের উপার্জনে নূরকে কিভাবে বড় করেছেন সেটা নূরের ভোলার কথা নয়। সংগ্রামের মধ্য দিয়েই পটুয়াখালীর গলাচিপা থেকে নূরের আজকের অবস্থান। তিনি চর বিশ্বাস জনতা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে ঢাকায় আসেন। এরপর গাজীপুরের কালিয়াকৈর থেকে এসএসসি ও উত্তরা হাই স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্য বিভাগে ভর্তি হন। তবে মাঝখানে নূর পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ব বিদ্যালয়েও ভর্তি হয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরুটা তার তেমন পরিচিতি না থাকলেও তাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দিয়েছে দেশব্যাপী আলোচিত কোটা সংস্কার আন্দোলন। আন্দোলনকারী সংগঠনের নাম দেয়া হয় বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। নেতৃত্ব দেয়ার কারণে এ সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক করা হয় তাকে। কোটা সংস্কার আন্দোলন করতে গিয়ে হামলা, মামলা মুখোমুখি হন নূর।

লেখক: রেজাউল করিম
কোটাবিরোধী আন্দোলনের সময় নূরকে বেধরক পেটানো ঘটনাও ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের পা জড়িয়ে ধরে বাঁচার আর্তনাদের ছবি দেখে এখনও অনেকের চোখ ভিজে আসে। মানুষকে মানুষ এভাবে মারতে পারে! এমনকি তাকে জেলেও দেয়া হয়েছে। ওই সময় তাকে বেসরকারি হাসপাতালে প্রকাশ্যে চিকিৎসা দেয়া হয়নি। তবুও চালিয়ে গেছেন সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন। এমনকি ডাকসু নির্বাচন চলাকালে নির্বাচনে অনিয়মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে মারধরের শিকার হয়েছেন। তারপরও তাকে দমিয়ে রাখা যায়নি। শেষ পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভোট দিয়ে তাকেই নেতা নির্বাচিত করেছেন। এতো সংগ্রামের পর আজকের নূরকে ছোট ভাবার কোন সুযোগ নেই।
যে নূরের পাশে একসময় সাধারণ শিক্ষার্থী ছাড়া কাউকে নজরে পড়েনি সেই নূরের প্রতিটি পদক্ষেপে এখন সবার নজর। যে নূরের প্রতিবেদন প্রকাশ করতে গণমাধ্যমের অনিহা ছিল এখন তাদের ক্যামেরা যেন নূরের পিছু ছাড়ছে না। সে উবারে গেল না সরকারি গাড়িতে গেল বিশ^বিদ্যালয় বাসে গেল নাকি গণভবন থেকে পাঠানো গাড়িতে গেল? সে ছাত্রলীগের সাথে গেল, না আলাদা গেল এনিয়ে প্রতিমূহুর্তে আপডেট খবর প্রকাশ করছে গমাধ্যমে। সেইসব সংবাদের পক্ষে-বিপক্ষে ফেসবুকে ঝর। তাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা সব পক্ষ থেকেই চলছে। সম্পূর্ণ পলিটিকাল ব্যাকগ্রাউন্ডবিহীন একটা সাধারণ ছাত্র কতদিন এসব চাপ সামলাতে পারবে সেটা একটা বড় প্রশ্ন। তিনি যা করেছে তারই বা কমতি কোথায়? কোটা আন্দোলনের মত একটা সফল আন্দোলনের পর তার কাছে আর কিছু না চাওয়াটাই ভাল। তাকে একটু তার মত করে কাজ করতে দিন। অনেক কিছুতেই কেউ প্রতিবাদ করতে পারছে না তাই এই ছেলেটার উপরেই সবার চোখ। আশা ভরসার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। রাজনীতিতে পরিপক্ক হওয়ার আগে এত চাপে তিনি যেন কোন ভুল না করে বসেন।
ইতোমধ্যে ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, বিশাল আকারে কারচুপি করেও কেবল জনপ্রিয়তার কারণে নুরুল হক নূরকে পরাজিত করতে পারেনি সরকারদলীয়রা। পাশাপাশি নবনির্বাচিত নূরের মধ্যে তরুণ বঙ্গবন্ধুর ছায়া দেখছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে কোটা আন্দালনের আরও অনেক নেতা জয়লাভ করতো বলেও মনে করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে গণভবনে গিয়েছিলেন নূররা।
বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার আন্দোলন পরিষদের নেতা ডাকসু ভিপির সামনে এখন অনেক কাজ বাকি। ক্ষমতাসিন দল ছাত্রলীগকে টপকিয়ে নূরের জয়টা মুলত সারাদেশের কোটা আন্দোলনকারীদের ভালোবাসার জয়। অতএব নূরের অবস্থান ধরে রাখতে সাধারণ শিক্ষার্থীর সেই ইচ্ছেগুলোকে এখন পূরণ করতে হবে। দাবি আদায়ের একটি প্লাটফর্র্মও তৈরি হয়েছে। পাচ দফা দাবিগুলো হলো-কোটা ব্যবস্থা সংস্কার করে ৫৬ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা, কোটায় কোনো ধরনের বিশেষ নিয়োগ না দেয়া, চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটা সুবিধা একাধিকবার ব্যবহারের সুযোগ না দেয়া, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সবার জন্য অভিন্ন বয়সসীমা নির্ধারণ করা ও কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে শূন্য পদগুলোতে মেধায় নিয়োগ প্রদান করা। এটা কিন্তু নূরের একার দাবি নয়। এটা দেশের সকল সাধারণ শিক্ষার্থীর দাবি ছিল। সেই দাবি এখন পূণরুজ্জীবিত হবে।
মানুষ যখন নীতিতে অটল থাকে তখন সেই অটল নীতি বোধই হচ্ছে নৈতিকতা। বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের অন্যতম যুগ্ম-আহ্বায়ক নুরুল হক নূর যদি তার নিজের অবস্থানে অটল থাকে। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর সমর্থনের ভাষা বুঝে এবং তার নিজের অবস্থানে, নীতি-নৈতিকতার স্থানে অটল থাকে অর্থাৎ যে কারণে সে এখনও সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের বড় একটি অংশের সমর্থন পাচ্ছে সেই ছাত্র-ছাত্রীদের সমর্থনকে যদি সে মুল্যয়ন করতে পারে তাহলে নূর শুধু ঢাবির ভিপি হবে না, নূর হবে ষোল কোটি মানুষের নেতা।
আন্দোলনরত নূরকে সবাই অন্য দলের কর্মী হিসেবে চালিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতো। তখন নূরকে জোরপূর্বক শিবির কর্মী বানাতেও দিধা করতো না। এখন নির্বাচিত ভিপি নূরকে সবাই নিজের দলে টানার চেষ্টা করছে। ছাত্রলীগ চাইবে কিভাবে তাকে সাথে রেখে একাট্টা হয়ে কাজ করা যায়। সকালে নূরকে ছাত্রলীগের ধাওয়ার পর, ভুল শুধরে বিকালে গিয়ে শোভনের কোলাকুলি তারই বহিঃপ্রকাশ। ছাত্রদলও চাইবে তাদের অপরাগতা চাহিদাগুলো নূরের মাধ্যমে প্রকাশ করা যায়। ছাত্রলীগকে ছাত্রদলের পাল্টা ধাওয়াও নূরের পক্ষে থাকার প্রথম ধাপ।
নির্যাতিত নূর যেহেতু তার বুদ্ধিমত্বা দিয়ে আজ ডাকসু ভিপি হতে পেরেছেন চলতে দিন তাকে তার নিজের মতো করে। এখন তাকে কাজের পরিবেশ সৃস্টি করে দেওয়াটা আমাদের দায়িত্ব।
লেখক: একজন সংবাদকর্মী
বাসাইলসংবাদ/একেবি




