
পারভেজ খান :
উত্তরবঙ্গের দরজা হিসেবে খ্যাত মির্জাপুর উপজেলা রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় ৬৮ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে এবং টাঙ্গাইল সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। ঐতিহাসিকভাবেও মির্জাপুরের রয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। ১৯৮২ সালের ৭ নভেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এটিকে বাংলাদেশের প্রথম ‘মান উন্নীত থানা’ হিসেবে উদ্বোধন করেন। প্রায় ৩৭৩.৮৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই উপজেলা টাঙ্গাইল জেলার মোট আয়তনের প্রায় ১১ শতাংশ জুড়ে বিস্তৃত। জনশ্রুতি রয়েছে, মোঘল আমলে কালেক্টর মির্জা হুসেন বর্তমান মির্জাপুর এলাকার জমি লিজ গ্রহণ করেন। ধারণা করা হয়, তাঁর নামানুসারেই পরবর্তীতে এ অঞ্চলের নামকরণ হয় ‘মির্জাপুর’। মির্জাপুরের উত্তর পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বংশাই নদী আর দক্ষিণ পাশ দিয়ে বয়ে গেছে লৌহজং নদী।

মির্জাপুর উপজেলাটিতে রয়েছে ১টি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়ন। মোট জনসংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ২৩ হাজার ৭০৮ জন; এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ২ হাজার ৮৮২ জন এবং মহিলা ২ লাখ ২০ হাজার ৮২৬ জন। উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে মোট ২৫৭টি গ্রাম, যা মির্জাপুরের সমৃদ্ধ গ্রামীণ জনপদের পরিচয় বহন করে। শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রেও এ উপজেলার অগ্রগতি লক্ষণীয়; বর্তমানে এখানকার শিক্ষার হার প্রায় ৫৫.৫ শতাংশ।
মির্জাপুর উপজেলার উত্তর-পূর্ব দিকের কিছু অংশ ছাড়া অধিকাংশ এলাকা প্লাবন সমভূমি অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। তবে উপজেলার উত্তর-পূর্বাংশে বিস্তৃত রয়েছে প্লাইস্টোসিন যুগের প্রাচীন ভূ-গঠন—ভাওয়াল-মধুপুর ট্র্যাকের অংশবিশেষ। লতিফপুর, তরফপুর, আজগানা ও বাঁশতৈল ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই অঞ্চল উপজেলার মোট ভূ-ভাগের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জুড়ে বিস্তৃত। সমতল ভূমি থেকে অপেক্ষাকৃত উঁচু এ অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে ছোট-বড় অসংখ্য লাল মাটির টিলা। সমতল ভূ-প্রকৃতির মাঝে এসব উঁচু টিলা ও গজারি বনাঞ্চলের উপস্থিতি এলাকাটিকে দিয়েছে এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। এ কারণেই স্থানীয় মানুষ এই অঞ্চলকে ‘পাহাড়ি এলাকা’ কিংবা ‘চালা’ নামে অভিহিত করে থাকেন, যার অর্থ উঁচু জমি। এ অঞ্চলের মাটি সাধারণত লাল ও আঠালো প্রকৃতির। লোহা ও অ্যালুমিনিয়ামসমৃদ্ধ এই মাটি কৃষি ও প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের দিক থেকেও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই অঞ্চলে প্রায় ১১,৮৩২ একর বনভূমি রয়েছে।
প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা এ অঞ্চল শুধু ভূ-প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের কারণেই অনন্য নয়; ইতিহাস, সংস্কৃতি, কৃষি ও জনজীবনের বৈচিত্র্যও একে করেছে স্বমহিমায় উজ্জ্বল। জনপদজুড়ে ছিল ঘন বনভূমি, ঝোপঝাড় আর বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ। স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিচারণে জানা যায়, অতীতে এ অঞ্চলে বিভিন্ন প্রজাতির বাঘ, হরিণ ও ময়ূরের দেখা মিলত। বনাঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে ছিল আনই, বংকই, লটকন, ডেউয়া, গাব ও চালতার মতো নানা ফলজ বৃক্ষ। পাশাপাশি হরিতকী, বহেড়া ও আমলকীর মতো মূল্যবান ঔষধি গাছও ছিল প্রচুর। কিন্তু সময়ের প্রবাহে নগরায়ন, বন উজাড় এবং মানুষের বসতি সম্প্রসারণের ফলে সেই প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য আজ অনেকটাই হারিয়ে গেছে; অনেক গাছপালা ও বন্যপ্রাণী বিলুপ্তির পথে, আবার কিছু ইতোমধ্যেই কেবল স্মৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই জনপদের মানুষ সরল, অতিথিপরায়ণ ও কর্মঠ। পালাগান, বাউল ও লোকসংগীত এখানকার সংস্কৃতিকে প্রাণবন্ত করেছে।
মির্জাপুরের পাহাড়ি জনপদ একসময় বিস্তীর্ণ শাল-গজারির বনভূমিতে আচ্ছাদিত ছিল। যত্রতত্র দেখা যেত বাঁশঝাড়, বেত আর দেশীয় আম, কাঁঠাল, জাম ও তেঁতুলের সমারোহ। উঁচু ভূমির কড়ই গাছের বিশালতা এই জনপদের শোভা বাড়াত। তবে বর্তমানে এই চিরচেনা দৃশ্যে পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয় আম-কাঁঠালের পাশাপাশি এখন বাণিজ্যিকভাবে গড়ে উঠেছে আধুনিক জাতের ফলের বাগান। বিশেষ করে আম্রপালি ও হাড়িভাঙ্গা আমের বাগান, পেয়ারা, লেবু এবং আধুনিক ড্রাগন ফল ও পেঁপের ব্যাপক চাষ হচ্ছে। কাঠের চাহিদা মেটাতে এক সময় দ্রুত বর্ধনশীল ইউক্যালিপটাস বা আকাশমণি গাছ জনপ্রিয় হলেও পরিবেশগত প্রভাবের কারণে মানুষ এখন মেহগনি চাষে বেশি ঝুঁকছে।
এক সময় এ অঞ্চলে বর্ষার পানির ওপর নির্ভর করে আমন ও আউশ ধানের চাষ হতো। শীতের সকালে মাঠ জুড়ে দেখা যেত সরিষার হলুদ কার্পেট এবং মুগ ও মাসকলাই ডালের প্রাচুর্য। বর্তমানে সেচ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে চিত্রটি ভিন্ন। আউশের জায়গা দখল করেছে উচ্চফলনশীল বোরো ও আমন ধান। এছাড়া বর্তমানে এখানকার উঁচু ও ঢালু জমিতে সারা বছরই উন্নত মানের শীতকালীন ও গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি চাষ হচ্ছে, যা স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে। মির্জাপুরের পাহাড়ি অঞ্চলের লাল মাটি শুধু কৃষিকাজেই নয়, গ্রামীণ কুটিরশিল্পেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ অঞ্চলের কামার ও কুমার সম্প্রদায় এই লাল মাটি ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের হাঁড়ি-পাতিল, কলস, তৈজসপত্র ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাদের হাতের নিপুণ কারুকাজে তৈরি এসব মাটির জিনিসপত্র একসময় গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। উঁচু ও পাহাড়ি লাল মাটির এই জনপদে একসময় স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত লাল মাটি দিয়েই ব্যাপকভাবে ঘর নির্মাণ করা হতো। শক্ত ও দৃঢ় প্রকৃতির এ মাটির ঘর গ্রীষ্মে শীতল এবং শীতে আরামদায়ক পরিবেশ প্রদান করত। শুধু আবাসনেই নয়, লাল মাটি উন্নত মানের ইট তৈরির জন্যও অত্যন্ত উপযোগী। ফলে এ মাটি এ অঞ্চলের জনজীবন, স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
এই পাহাড়ি অঞ্চলের অন্তর্গত বাঁশতৈল ইউনিয়নের পেকুয়া, বংশীনগর, তালতলা, কাইতলা, গায়রাবেতিল, চানু মার্কেট, মোতারচালা, পুকুরপার ও বটতলা, পাশাপাশি আজগানা ইউনিয়নের তেলিনা ও খাইটারঘাট এলাকায় প্রায় তিন হাজার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী আদিবাসী পরিবারের বসবাস। এ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠী বর্মন ও কুচ সম্প্রদায়ের মানুষ, যারা দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনধারা ধারণ করে এ জনপদে বসবাস করে আসছেন। জীবিকার প্রয়োজনে তাদের অধিকাংশ মানুষ মাটি কাটা, কৃষিকাজ, দিনমজুরি ও ভ্যান চালানোর মতো শ্রমনির্ভর পেশায় নিয়োজিত। পাহাড়ি অঞ্চলের অধিকাংশ সড়ক এখনো কাঁচা হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে সেগুলো হাঁটুসমান কাদায় পরিণত হয়। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের চলাচল, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
অন্যদিকে, অপরিকল্পিতভাবে পাহাড়ি টিলা কেটে সমতল ভূমিতে রূপান্তরের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে, যা পরিবেশের ভারসাম্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রাকৃতিক টিলা, বনাঞ্চল ও লাল মাটির বৈচিত্র্যময় ভূপ্রকৃতিকে কেন্দ্র করে এখানে ইকো-ট্যুরিজম গড়ে তোলার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং রাস্তাঘাট ও অবকাঠামোর উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে মির্জাপুরের এই পাহাড়ি জনপদ ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
পরিশেষে – লাল মাটির পাহাড়ি জনপদ শুধু একটি ভৌগোলিক এলাকা নয়; এটি প্রকৃতি, ইতিহাস ও সম্ভনার এক জীবন্ত জনপদ। যথাযথ পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং জনসম্পৃক্ত উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে এই জনপদ ভবিষ্যতে টাঙ্গাইলের অন্যতম অর্থনৈতিক পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। প্রকৃতিকে রক্ষা করেই উন্নয়নের পথ খুঁজে নেওয়াই হতে পারে মির্জাপুরের পাহাড়ি জনপদের টেকসই ভবিষ্যৎ।
লেখক: স্কুলশিক্ষক, কলামিস্ট।
বাসাইলসংবাদ, ২৬ মে, ২০২৬ /একেবি
সকলের অবগতির জন্য নিউজটি শেয়ার করুন




