
পারভেজ খান :
টাঙ্গাইলের করটিয়া বঙ্গের এক প্রাচীন জনপদ, যার ধুলিকণায় মিশে আছে শিক্ষা আর সংস্কৃতির ঘ্রাণ। লৌহজং নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা সরকারি সা’দত কলেজ কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি তপ্ত রোদে এক বিশাল বটবৃক্ষের ছায়া। অখণ্ড বাংলার অনগ্রসর মুসলমানদের মধ্যে আধুনিক শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া, শিক্ষার হার বৃদ্ধি এবং সাংস্কৃতিক নবজাগরণের উদ্দেশ্যে করটিয়ার জমিদার দানবীর ওয়াজেদ আলী খান পন্নী (চাঁদ মিয়া) ১৯২৬ সালে ১লা জুন তাঁর পিতামহ সাদত আলী খান পন্নীর নামে কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন,যা অখণ্ড বাংলায় কোনো মুসলিম জমিদারের গড়া প্রথম কলেজ। স্যার সৈয়দ আহমদ খানের আলিগড় আন্দোলনের আদলে এটি প্রতিষ্ঠা করা, এজন্য একে ‘বাংলার আলীগড়’ বলা হয়।এই কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক ইবরাহীম খাঁ।প্রতিষ্ঠাকাল থেকে টানা ২১ বছর তিনি অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।এজন্যই ইবরাহীম খাঁ ‘ প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ’ নামে সারা দেশে পরিচিত পান।তাঁর হাতেই কলেজ বিকশিত হয়।

১৯৩৮ সালে কলেজটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ডিগ্রি ( স্নাতক) পর্যায়ে উন্নীত হয়।কলেজের বর্তমান মূল ভবনটির ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। ১৯৩৯ সালে স্থাপন করা এই ভবনেই এখনো চলছে কলেজের মূল কার্যক্রম। ইবরাহীম খাঁর পর অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন আরও অনেক গুণী শিক্ষাবিদ। তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রখ্যাত লোকগবেষক তোফায়েল আহম্মেদ।তাঁর হাতেই ১৯৬২-৬৩ শিক্ষবর্ষে(১৯৬৬ সালে ৪টি বিষয় পূর্ণাঙ্গ রুপ পায়) এই কলেজ চালু হয় স্নাতক সম্মান কোর্স।পরে ১৯৭৪-৭৫ শিক্ষাবর্ষে স্নাতকোত্তর কোর্স চালু হয়। ১৯৭৯ সালে ৭ জুলাই কলেজটি জাতীয়করণ করা হয়।বর্তমানে কলেজটিতে ১৮টি বিষয় স্নাতক সম্মান কোর্স এবং ১৬ টি বিষয়ে স্নাতকোত্তর ( শেষ পর্ব) কোর্স চালু আছে।এছাড়াও পাস কোর্স রয়েছে।১৯৯৬ সালে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণি বন্ধ করে পুরোপুরি ভাবে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নতুন পরিচয়ে আত্নপ্রকাশ করে।বর্তমানে প্রায় ২০০০০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে এটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ অন্যতম সেরা কলেজ।এই প্রতিষ্ঠান জন্ম দিয়েছে অসংখ্য গুনী ব্যক্তিত্ব – পি.সি সরকার(জাদুকর),শামসুল হক(আওয়ামী মুসলিমলীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদক),আব্দুল হক(লেখক),বন্দে আলী মিয়া(কবি),সেমিল আল দীন(নাট্যকার),আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী (মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক),শাজাহান সিরাজ(স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠক),ওসমান গনি(জানিসংঘের নিরীক্ষক বোর্ডের চেয়ারম্যান) । তাঁরা সবাই হেঁটেছেন এই ক্যাম্পাসে।
৩৭ একর জুড়ে বিস্তৃত সবুজে ঘেরা এই ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে ৫টি একাডেমিক ভবন,৭টি ছাত্র-ছাত্রী হল,৬টি নিজস্ব বাস ও নির্মাণাধীন ৪ তলা বিশিষ্ট মসজিদ। সমৃদ্ধ দ্বিতলা লাইব্রেরিতে রয়েছে হাতে লেখা পবিত্র কোরআন শরীফ,মহাকাব্য শাহানামা সহ ২৮ হাজার ৩০০ টি গ্রন্থ।বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এসেছিলেন এই কলেজে।তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করে নির্মিত হয়েছে নজরুল কুটির।এছাড়াও কলেজে অধ্যক্ষের ভবন, শহীদ মিনার, বিশাল খেলার মাঠ,দুটি পুকুর, ক্যানটিন, ডাকঘর, চিকিৎসাকেন্দ্র রয়েছে।কলেজে বিএনসিসি, রোভার স্কাউট, গার্লস ইন রোভার, রেড ক্রিসেন্ট, রক্তদাতাদের সংগঠন বাঁধনের কার্যক্রম রয়েছে এবংশিল্পলোক, আবৃত্তি সংসদ, ডিবেটিং ক্লাবসহ কয়েকটি সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক সংগঠন সক্রিয় আছে।ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ বাংলার প্রতিটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ে জড়িয়ে আছে সরকারি সা’দত কলেজের ছাত্র ও শিক্ষকের নাম।শতাব্দির ইতিহাস বুকে ধারণ করে আজও এটি গ্রাম-বাংলার অগনিত স্বপ্নের দ্বীপশিখা হয়ে জ্বলছে।
স্মৃতি মানুষের জীবনের এক অমূল্য সম্পদ। বিশেষ করে জীবনের স্বর্ণালি সময়টা যখন কাটে টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী সরকারি সা’দত কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে, তখন সেই স্মৃতিগুলো যেন বারবার হৃদয়ে নাড়া দিয়ে যায়। আমি ছিলাম ২০০৬-০৭ শিক্ষাবর্ষের একজন ছাত্র।সরকারি সা’দত কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ ২০০৪-০৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে শুরু হলে আমরা ছিলাম তৃতীয় ব্যাচ। এই বিভাগের যে সব নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকেরা প্রতিষ্ঠালগ্নে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অধ্যাপক আব্দুস সালাম ও সহযোগী অধ্যাপক এএসএম মনোয়ার হোসেন মোল্লা স্যার ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁদের প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও একাডেমিক নেতৃত্ব বিভাগটিকে একটি সুসংগঠিত ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সহকারী অধ্যাপকগণ—মোঃ রুহুল কুদ্দুস চৌধুরী, মোঃ হেলাল উদ্দিন, মোঃ আবুল কালাম আজাদ, মোঃ আব্দুল রাজ্জাক ও প্রভাষক গাজী মো:কাওছার স্যারের আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে আমাদের আলোকিত করেছেন।তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা শুধু শিক্ষিত নই, মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার প্রেরণা পেয়েছি।
আমাদের ব্যাচটা ছিল প্রাণচঞ্চল আর বন্ধুত্বে ভরপুর। আজও চোখের সামনে ভেসে ওঠে বন্ধু রাজা, ফরিদ, জয়, রাজ্জাক, সুমন, আলমগীর, নাজমুল, কাউছার, মোখলেছ,হারুন,মামুন,স্বপ্না, যুথী, লিতা,সালমা, তাসলিমা আর শিউলির হাসিমুখগুলো। আমাদের মধ্যে রাজা ছিল একটু ব্যতিক্রমী। ও শুধু পড়াশোনাতেই নয়, উপস্থাপনা, বক্তব্য আর অভিনয়েও ছিল সমান পারদর্শী। অন্যদিকে নাজমুলের কণ্ঠের গান আমাদের একঘেয়েমি দূর করে দিত। আমি (পারভেজ খান)আর রাজা ছিলাম বিভাগীয় শিক্ষকদের অত্যন্ত প্রিয় ছাত্র, যা আমাদের জন্য ছিল অনেক বড় আনন্দের।
তবে আমার জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল দিনটি ছিল ২২ জুলাই ২০২৩। সেদিন অনার্স ফাইনালের ফলাফল প্রকাশিত হলে দেখা যায়, পুরো ব্যাচে আমি একাই প্রথম শ্রেণি অর্জন করেছি। খবরটি শুনে যখন বিভাগে গেলাম, শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরা আমাকে পরম মমতায় জড়িয়ে ধরলেন। তাঁদের সেই আলিঙ্গন আর আনন্দাশ্রু আমাকে এক অপার্থিব তৃপ্তি দিয়েছিল। সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল, একজন শিক্ষার্থীর জীবনে এর চেয়ে বড় সম্মান ও অর্জন আর কিছুই হতে পারে না। প্রিয় ক্যাম্পাস আর শিক্ষকদের সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ পাথেয় হয়ে থাকবে।
পরিশেষে -“স্মৃতির আয়নায় ভেসে ওঠা এই শতবর্ষ শুধু সময়ের হিসাব নয়, এটি এক অমলিন ভালোবাসার নাম। সরকারি সা’দত কলেজ আমাকে দিয়েছে স্বপ্ন দেখার সাহস। শতবর্ষ পেরিয়ে এই প্রিয় প্রতিষ্ঠান যেন আরও হাজারো শিক্ষার্থীর জীবন আলোকিত করে—এই কামনাই রইলো
লেখক: প্রাক্তন ছাত্র, সরকারী সা’দত কলেজ; স্কুলশিক্ষক।
বাসাইলসংবাদ, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ /একেবি
সকলের অবগতির জন্য নিউজটি শেয়ার করুন





