
নিজস্ব প্রতিবেদক : ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে রাজশাহীগামী চলন্ত বাসে ডাকাতি ও নারী যাত্রীদের শ্লীলতাহানীর ঘটনায় জড়িত ডাকাত দলের সদস্যরা সবাই নেশাগ্রস্থ। বাস থেকে লুন্ঠনকৃত একটি মোবাইল সেটের বিনিময়ে গাঁজা কিনে সেবন করে। আর ওই গাঁজা বিক্রেতার সূত্র ধরেই সন্ধান মেলে ডাকাত চক্রের সদস্যদের। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ঘটনার সাথে জড়িত তিনজনকে গ্রেফতার করে। মামলার তদন্ত ও অভিযুক্তদের গ্রেফতারের সাথে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন।

সূত্র জানায়, এই ঘটনায় জড়িতরা সবাই অতিমাত্রায় মাদকাসক্ত। নেশার টাকা সংগ্রহের জন্যই তারা সাভার আশুলিয়া এলাকায় বাস ডাকাতিসহ ছিনতাই ও নানা অপকর্ম করে থাকে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (দক্ষিণ) উপপরিদর্শক (এসআই) আহসানুজ্জামান জানান, তদন্তের দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার করে বুঝতে পারেন ডাকাত দলের সদস্যরা সাভার আশুলিয়া এলাকার। তখন তিনি তার একজন সোর্সের মাধ্যমে জানতে পারেন ওই এলাকার নেশাখোর কিছু যুবক বাস ডাকাতিসহ নিয়মিত চুরি, ছিনতাই করে থাকে। তারা সাভার এলাকার একজন মাদক কারবারির কাছ থেকে নিয়মিত গাঁজা, হেরোইন ক্রয় করে। সোর্সের তথ্য অনুযায়ি শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে সাভারের চন্দ্রা-নবীনগর সড়কের একটি পেট্টোল পাম্পের সামনে থেকে ওই মাদক কারবারিকে আটক করে। প্রায় ২৩ বছর বয়সী ওই মাদক কারবারি পুলিশকে জানায়, কয়েকদিন আগে একটি মোবাইল সেটের বিনিময়ে তার কাছ থেকে শহিদুল, সবুজ ও শরীফুজ্জামানসহ কয়েকজন গাঁজা নিয়ে গেছে। তখন ওই মাদক কারবারিকে সাথে নিয়ে পুলিশ শহিদুলদের সন্ধানে বের হয়। ওই মাদক কারবারির সাথে পুলিশ সাভারের গেন্ডা এলাকা যায়। বিকেল ৫টার দিকে সেখানে অটোমোবাইল গ্যারেজে থাকা একটি বাসে ঘুমাচ্ছিল সবুজ ও শরীফুজ্জামান। গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা বাসটিতে ঢুকেই তাদের হাতকড়া পড়িয়ে ফেলেন। তারা নেশায় এতটাই বুঁদ হয়েছিল যে হাতকড়া পড়ানোর পরও বুঝতে পারেনি। পুলিশ তাদের ডেকে তুলে। বাসের ভেতরেই ডাকাতির বিষয়ে প্রশ্ন করা শুরু করে। পুলিশ যখন দুইজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল সেই সময় বাসটির কাছে আসে ডাকাত দলের অপর সদস্য শহিদুল ইসলাম। তাকেও ধরে ফেলা হয়। শুক্রবার গভীর রাতে তাদের টাঙ্গাইল নিয়ে আসা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সবাই ডাকাতির সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে।
এ ঘটনায় গ্রেফতারকৃতরা হলেন- মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর উপজেলার লাউতারা গ্রামের বদর উদ্দিন শেখের ছেলে শহিদুল ইসলাম ওরফে মহিদুল মুহিত (২৯), শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলার রামকৃষ্ণপুর গ্রামের ইসমাইল মোল্লার ছেলে মো. সবুজ (৩০) ও ঢাকার সাভারের টান গেন্ডা এলাকার আবুল হোসেনের ছেলে শরীফুজ্জামান ওরফে শরীফ (২৮) । এদের মধ্যে শহিদুল ইসলাম ওরফে মহিদুল মুহিতের বিরুদ্ধে সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া থানায় একটি ও ঢাকা জেলার সাভার মডেল থানায় একটি বাস ডাকাতি মামলাসহ মোট পাঁটি মামলা রয়েছে। গত শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি) রাতে ঢাকার সাভারের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদেরকে গ্রেফতার করে টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ। এরআগে শুত্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকালে বাসের যাত্রী ওমর আলী বাদি হয়ে অজ্ঞাতনামা ৮ থেকে ৯জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
পুলিশ জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, নেশার টাকার জন্যই তারা ডাকাতি, ছিনতাই করে থাকে। এসব কর্ম করে যে টাকা পায় তা দিয়েই নেশা করে। টাকা শেষ হয়ে গেলে আবার ডাকাতি, ছিনতাই শুরু করে। শহিদুলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ। আর
সবুজ ও শরীফুজ্জামান টাঙ্গাইলের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্টেট আদালতে ঘটনার সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে ঘটনার সাথে জড়িত আরও ৩ জনের নাম-ঠিকানা তারা জানিয়েছেন বলে আদালত সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে, মামলার বাদি বাসের যাত্রী ওমর আলী শনিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) টাঙ্গাইল গোয়েন্দা কার্যালয়ে গিয়ে গ্রেফতারকৃতদের শনাক্ত করেন।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (দক্ষিণ) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর মোশারফ হোসেন জানান, ডাকাতির সাথে বাসটির চালক ও তার সহকারিদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।
মামলা দায়েরের পর টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মোঃ মিজানুর রহমান জেলা গোয়েন্দা পুলিশ ও মির্জাপুর থানা পুলিশের সমন্বয়ে একটি বিশেষ টিম গঠন করে দেন। ওই দিনই টিমের সদস্যরা ডাকাতদের সন্ধানে মাঠে নামে।
টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে কয়েকজন যাত্রীর কাছে বিষয়গুলো শুনেছি। সেখানে প্রাথমিকভাবে যে বিষয়টি এসেছে, এখানে কোনও ধরণের ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। এখানে নারীদের কাছ থেকে কিছু স্বর্ণ এবং রূপা লুণ্ঠিত হয়েছে। এই লুণ্ঠন করার সময়ে দুষ্কৃতকারী ডাকাতরা নাকফুল ও নাকেরদুল যখন নিচ্ছিল, তখন হয়তো তাদের সাথে (নারী) টাচে গিয়েছে। একটা পর্যায়ে গিয়ে তাদের সাথে গিয়ে এই কাজগুলো করতে হয়েছে। সেটুকু আমরা জানতে পেরেছি, প্রাথমিকভাবে। প্রাথমিকভাবে কোনও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি, এটা শ্লীলতাহানির পর্যায়ে বলা যেতে পারে।’
প্রসঙ্গত, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকার গাবতলী থেকে ছেড়ে আসা রাজশাহীগামী ইউনিক রোড রয়েলস পরিবহনের একটি (ময়মনসিংহ-ব-১১-০০৬১) চলন্তবাসে ডাকাতি ও নারীদের শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটে।
এ ঘটননায় শুত্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকালে বাসের যাত্রী ওমর আলী বাদি হয়ে মির্জাপুর থানায় অজ্ঞাতনামা ৮ থেকে ৯জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। পরে ঘটনার সাথে জড়িত ডাকাতদলের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করে টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ।
বাসাইলসংবাদ, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ /একেবি
সকলের অবগতির জন্য নিউজটি শেয়ার করুন






