
নিজস্ব প্রতিবেদক : মেধাবী ছাত্রী নুর নাহার (১৪)। বাবা-মায়ের আদর-¯েœহ থেকে বঞ্চিত প্রায় ১০ বছর। দরিদ্র পরিবারে জন্ম হওয়ায় নানার বাড়িতে বেড়ে ওঠা তার। নুর নাহারের চোখে-মুখে এখনও কৈশোরের দুরন্তপনা। এখনও বোঝা হয়নি বিয়ে কী? এই বয়সে সহপাঠীদের সঙ্গে দলবেঁধে মাঠে লেখাধূলা ও আড্ডায় মেতে উঠার কথা। কিন্তু এই শিশুকালেই তাকে সংসার পাততে ৩৫ বছর বসয়ী প্রবাস ফেরত এক ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে দেয়া হয়। প্রবাসী ছেলে ও যৌতুকবিহীন হওয়ায় লোভ সামলাতে না পেরে নিরীহ পরিবারটি অষ্টম শ্রেণিতে পড়–য়া নুর নাহারকে তুলে দেয় বাবার বয়সী রাজিব খানের হাতে। তার পরিবার ও পাষন্ড স্বামীর ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই আজ প্রাণ দিতে হলো মেধাবী ছাত্রী নুর নাহারকে। শিশু গৃহবধূর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের কারণে রক্তক্ষরণ হয়ে বিয়ের ৩৪ দিনের মাথায় গত ২৪ অক্টোবর নুর নাহার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। ঘটনাটি ঘটেছে টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার ফুলকি পশ্চিমপাড়া গ্রামে।

এদিকে নিহত নুর নাহারের স্বামীর বাড়ির পক্ষ থেকে গ্রাম্য সালিশে উক্ত বিষয়টি মীমাংসার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আইনী পক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টির বিচার না হলে বাল্যবিয়ের বলি অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী নুর নাহারের পরিবার ন্যায্য বিচার পাবে না বলে সচেতন মহলের দাবি।
নিহতের পরিবার সূত্রে জানা যায়, নুর নাহারের বাবা রিকশাচালক ও মা গার্মেন্টসকর্মী। অভাব অনটনের সংসার হওয়ায় তাদের পরিবারে ঝগড়া লেগেই থাকতো। এ কারণে দিনমজুর নানা উপজেলার কাউলজানী ইউনিয়নের কলিয়া গ্রামের বাসিন্দা লাল খান পাশের উপজেলার নলুয়া কলাবাগান গ্রাম থেকে চার বছর বয়সী নুর নাহারকে তার বাড়িতে নিয়ে আসে। এরপর দিনমজুর নানা নুর নাহারকে স্কুলে ভর্তি করে দেন। এ বছর নুর নাহার কলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছিল। নানার সংসারও দরিদ্র হওয়ায় নুর নাহারকে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর এ বছরের ২০ সেপ্টেম্বর নুর নাহারকে উপজেলার ফুলকি পশ্চিমপাড়া গ্রামের আব্দুর রশিদের ছেলে প্রবাস ফেরত রাজিব খানের সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের সময় লাল খানের প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। আর এই টাকার ঝোগান দেন তার আত্মীয়-স্বজনরা। অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে হওয়ায় রক্তক্ষরণ শুরু হয় নুর নাহারের। রক্তক্ষরণ হলেও তার স্বামীর পাশবিকতা বিন্দুমাত্র কমেনি। রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় বিষয়টি নুর নাহার ও রাজিবের পরিবারে আলোচনা সৃষ্টি হয়। পরে রাজিবের পরিবারের পক্ষ থেকে গ্রাম্য করিবাজ দিয়ে চিকিৎসা করানো হয়। এছাড়াও স্বামীর বাড়ির লোকজন গত ২২ অক্টোবর নুর নাহারকে টাঙ্গাইলের একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে চিকিৎসা করান। ওই ক্লিনিক থেকে নুর নাহারকে তার পরিবারের কাছে বুঁঝিয়ে দিয়ে স্বামী রাজিব ও তার পরিবার কৌশলে সেখান থেকে কেটে পড়েন। পরে অবস্থার অবনতি হলে নুর নাহারের নিরীহ পরিবার তাকে মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালে ভর্তি করে। নুর নাহারকে চিকিৎসা করানোর মতো টাকাও ছিল না নিরীহ পরিবারটির হাতে। এরপর স্থানীয় গ্রামবাসী প্রায় ৬০ হাজার টাকা তুলে দেওয়ার পর সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নুর নাহারের পরিবার তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাতে তার মৃত্যু হয়। পর দিন রবিবার (২৫ অক্টোবর) ময়নাতদন্ত শেষে নুর নাহারের বাবা নুরু মিয়ার বাড়ি সখীপুর উপজেলার নলুয়া কলাবাগান এলাকায় লাশ দাফন না করে নানার বাড়ির স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

নুর-নাহার
নুর নাহারের নানা লাল খান বলেন, ‘অভাব অনটনের সংসার হওয়ায় নাতনি নুর নাহারকে ছোটবেলাতেই আমার বাড়িতে আনা হয়। আমি দিনজমুরের কাজ করি। সেই টাকা দিয়েই তাকে পড়াশোনা করাচ্ছিলাম। ছেলে প্রবাসী ও ধনি হওয়ায় আমরা নুর নাহারকে বিয়ে দিই। বিয়ের কয়েকদিন পর থেকে মেয়েটির রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এ জন্য নুর নাহারের শাশুড়ি তাকে গ্রাম্য কবিরাজের কাছ থেকে ওষুধ খাওয়াচ্ছিল। পরে রক্তক্ষরণ বেশি হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানকার ডাক্তাররা বলেছেন, অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে দেওয়ার কারণে নুর নাহারের গোপনাঙ্গ দিয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নুর নাহারের মৃত্যুর পর তার স্বামী রাজিব লাশও দেখতে আসেনি। মূলত স্বামীর কারণেই নুর নাহারের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি তার।
নুর নাহারের মামা লুৎফর খান বলেন, ‘নুর নাহারের মৃত্যুর বিষয়টি থানা পুলিশকে জানানো হয়েছে। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।’
নুর নাহারের শাশুড়ি বিলকিস বেগম বলেন, ‘নুর নাহারকে ভূতে ধরেছিল। এ জন্য তার গোপনাঙ্গ দিয়ে রক্ত বের হতো। পরে স্থানীয় কবিরাজ দিয়ে তাকে চিকিৎসা করানো হয়। এরপর তার বাবার বাড়ির লোকজন এসে তাকে নিয়ে যায়। পরে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়েছে।
কলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জাকির হোসেন বলেন, ‘নিয়মিত শিক্ষার্থীদের খোঁজ-খবর নেওয়া হতো। হঠাৎ করেই গোপনে নুর নাহারকে তার পরিবার বিয়ে দেয়। নুর নাহার একজন মেধাবী ছাত্রী ছিল। অষ্টম শ্রেণিতে তার রোল নম্বরও ২ ছিল। বিষয়টি অত্যান্ত দুঃখজনক। আমরা একজন মেধাবী ছাত্রীকে হারালাম।’

রাজিব
বাসাইল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফিরোজুর রহমান বলেন, নারীর প্রথম যৌন মিলনে ভয় ও আতঙ্ক কাজ করে। অপ্রাপ্ত বয়সে বিয়ে হলে রক্তক্ষরণ হতে পারে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামছুন নাহার স্বপ্না বলেন, ‘অষ্টম শ্রেণির একজন ছাত্রী বাল্যবিয়ের শিকার হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে। বিষয়টি অত্যান্ত দুঃখজনক ঘটনা। এ ধরণের অনেক ঘটনা আমাদের সামনে চলে এসেছে। বাল্যবিয়ে শুধু আইন দিয়ে নয়, সামাজিকভাবে এটি নির্মূল করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাল্যবিয়ে বন্ধের বিষয়ে সরকারের একটি নির্দেশনা রয়েছে। সে প্রেক্ষিতে আমরা একদিকে আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি, অন্যদিকে সচেতনামূলক কাজ করছি। তারপরও আমরা পুরোপুরি বাল্যবিয়ে নির্মূল করতে পারছি না। অভিভাবকরা প্রশাসনের চোখ আড়াল করে গোপনে তাদের মেয়েদের বিয়ে দিচ্ছে। বাল্যবিয়ের পরিণতি কিন্তু তারা ভোগ করছে। যাদের বাল্যবিয়ে হচ্ছে তারা নানান ভাবে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। তারা ঘর সংসারও করতে পারছে না। তারা আবার ফিরে আসছে বাবা-মায়ের কাঁধে বোঝা হয়ে।’
বাসাইল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হারুনুর রশিদ বলেন, ‘এ ঘটনায় কোনও লিখিত অভিযোগ পাইনি। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বাসাইলসংবাদ/ ২৮ অক্টোবর, ২০২০ /একেবি
সকলের অবগতির জন্য নিউজটি শেয়ার করুন




